প্রাচীরে ঠেকানো কাঠ

“যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিশ্চয় আল্লাহর রসূল।” আল্লাহ জানেন, নিশ্চয় তুমি তাঁর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।”

“When the hypocrites come to you, they say, “We testify that you are the Messenger of Allah.” And Allah knows that you are His Messenger, and Allah testifies that the hypocrites are liars.”

।।

What a Royal Statement!!

শত সহস্র উপন্যাসের হাজারো পাতা ছেঁকেও এরকম ‘বোল্ড স্টেটমেন্ট’ পাওয়া যাবে না। ওফ, ভাবের কি লা-জওয়াব উঠানামা। সোবহানআল্লাহ।

সূরা মুনাফিকুনের প্রথম আয়াত পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। যারা হালকা পাতলা আরবী জানেন তারা আরো ভালো বুঝবেন। আরো শুনবেন? ৪র্থ আয়াতের অনুবাদটি শোনেন –

“তুমি যখন তাদেরকে দেখো, তখন তাদের দেহাবয়ব, স্টাইল, ভাবভঙ্গী তোমার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যখন তারা কথা বলে, তুমি তাদের কথা মন দিয়ে শোনো। আসলে তারা তো প্রাচীরে ঠেকানো কাঠের মতো। কোন শোরগোল হলেই তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোও। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে। তারা কোথায় চলেছে তা জানো?”

প্রাচীরে ঠেকানো কাঠের উপমাটা দেখেন। কি যুৎসই উপমা। এই কাঠের জীবনের প্রধান চিন্তা তার ঠেকনা দেয়ার প্রাচীরটা যেন ঠিক থাকে। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকলেও তার আত্মা ধুক করে উঠে এই বুঝি তার প্রাচীর ভেঙে পড়ে আর সেও ধুপ করে পড়ে যায়।

কুরআন অধ্যয়নের সূচনা

যেসব মুসলমান নিয়মিত কুরআন পড়তে ও তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন কুরআনের প্রতি এ অবহেলার মূল্য একদিন তাদের পরিশোধ করতে হবে। যখন কবরে ফেরেশতারা তিনটি প্রশ্নের মাধ্যমে তাকে মুসলিম হিসেবে সনাক্ত করবেন তখন অবশ্যই প্রমাণিত হবে তার কিতাব ছিল কুরআন আর তার পরবর্তী প্রশ্নগুলো হবে তার সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে। তখন কেমন হবে তার অবস্থা যদি তিনি তার কিতাব সঠিকভাবে পড়তে না জানেন অথবা বলেন, আমাকে একটি কুরআনের ইংরেজী বা ফ্রেঞ্চ অনুবাদ দাও। তার এ আবেদন কুরআনের প্রতি তার সীমাহীন অবহেলাকে প্রকাশ করে দিবে।

অথচ আল্লাহতায়ালা সূরা আল-ক্বামারে কমপক্ষে ৪ বার এই আবেদন রেখেছেন যে, তিনি কুরআনকে শেখা, বুঝা ও তা থেকে উপকৃত হওয়ার বিষয়গুলো সহজ করে দিয়েছেন।

কুরআন অধ্যয়নের প্রথম শিক্ষা হল এই যে, কুরআনে বর্ণিত কোন শব্দ, বাক্য বা এমনকি নিছক কোন ব্যাকরণগত বিষয়াদি পর্যন্ত এমনি এমনি দেয়া হয়নি। এর প্রতিটি যের জবরের পেছনেও রয়েছে আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা। এমনকি কোন বাক্যাংশের অনুপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ কারণ তার মধ্যেও রয়েছে গভীর কোন শিক্ষা।

এজন্য কুরআনের সঠিক অধ্যয়ন ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ না কুরআনের পাঠ আরবী ভাষায় করা হয়। অন্য কোন ভাষায় কুরআনের অনুবাদ পাঠের মাধ্যমে তা কখনো সম্ভব নয়।

তথাকথিত সভ্য সমাজের নিয়ন্ত্রণ আজ যাদের হাতে তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনারবী মুসলমানদের আরবী শিক্ষার অধিকারকে নিষিদ্ধ করেছে। অবস্থা এমন যে ইউরোপে বসবাসরত অনেক আরবও আজ আরবীতে কুরআন পড়তে জানে না।

Methodology for the study of the Qura’n বইটি এসব মুসলমানদের এ বোধ জাগ্রত করার জন্য লিখিত হয়েছে যে তারা যেন কুরআনকে আরবীতে অধ্যয়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আরবী শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। যখন তারা তাদের আরবী শিক্ষার হারানো অধিকার ফিরে পাবে তখন তারা এ’ কিতাবের মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে দাজ্জালের প্রতারক রাষ্ট্র ইসরায়েলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত জবাব দিতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ সুবহানুহু ওয়াতায়ালা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সালামকে শুধু কুরআনের বার্তাবাহক হিসেবে পাঠান নি, বরং পাঠিয়েছেন কুরআনের শিক্ষক হিসেবে। কাজেই কুরআনের ছাত্রদের কুরআন বিষয়ে নবীজীর শিক্ষা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। যেমন, নবীজী চাইতেন, প্রতিটি মুসলমান যেন কুরআনের হৃদয় সূরা ইয়াসীন মুখস্থ করে।

কুরআনের আয়াত আমাদের জানায়, নবীজী ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সাল্লাম কুরআন শিক্ষা দেয়ার পূর্বেই মানুষের অন্তরকে তাযকিয়ার মাধ্যমে বিশুদ্ধ করতেন। কারণ আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আল্লাহমুখী হৃদয় ছাড়া কুরআন শিক্ষা করা সম্ভব নয়। অন্তরে দুনিয়ার প্রতি লোভ, মায়া, আসক্তি এসব কুরআন শিক্ষার অন্তরায়। তাযকিয়ার চেয়ে ভালো কিছু মুসলমানদের ওপর কখনো করা হয়নি যা বিগত সূফী শিক্ষকরা করে গেছেন।

যতদিন কুরআনের শিক্ষক নবীজী ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্যে জীবিত ছিলেন ততদিন কুরআনের যেকোন ব্যাখ্যার বিষয়ে তার আদেশই ছিল চূড়ান্ত। বর্তমানে আমরা কিভাবে কুরআনের এলেম অর্জন করতে পারি। আজ যখন তিনি আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তার হাদীস আমাদের মধ্যে উপস্থিত। কুরআন অধ্যয়নের জন্য কুরআন ও হাদীস শাস্ত্রের সমন্বয় কিভাবে করতে হয় এ বইটি সে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছে।

কুরআন অধ্যয়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করার পাশাপাশি চিন্তা-ফিকির করা অপরিহার্য। কারণ কুরআনের নিদর্শনগুলো আল্লাহতায়ালা চিন্তাশীলদের জন্য বর্ণনা করে থাকেন।

চিন্তাশীলরা অবশ্যই উপলব্ধি করতে পারেন যে, এ জাগতিক বিশ্ব আধুনিক সভ্য সমাজের তৎপরতার কারণে ধ্বংসের পথে অগ্রসরমান। জাগতিক ধ্বংসের পাশাপাশি মানবিকতাও ধ্বংসের সম্মুখীন যেখানে পাশ্চাত্য সমাজ ও তাদের তুর্কী, সৌদী ও পাকিস্তানী প্রক্সিদের অব্যাহতভাবে চাপিয়ে দেয়া বিভিন্ন অনৈতিক যুদ্ধের কারণে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন সহায়-সম্বলহীন ও নিঃস্বে পরিণত হচ্ছে। (সাথে ইন্ডিয়া ও বার্মা বাদ যাবে কেন? -অনুবাদক)

সারা বিশ্ব আজ এক ইউনিভার্সেল ফাসাদ দ্বারা আক্রান্ত। এর উপাদানগুলো হচ্ছে অনৈতিক যুদ্ধ, সেক্যুলার রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা, সেক্যুলার অর্থনীতি, মুদ্রানীতি, নারী বিপ্লব, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, কৃষি, পরিবহণ, যোগাযোগ, পানি সর্বত্র। কুরআন আজকের এই ইউনিভার্সেল ফাসাদ বা বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করে।

সভ্য সমাজের জালিম শাসক ও তাদের মোসাহেবদের ভয় এটাই যে একদিন লোকেরা স্বাধীনভাবে চিন্তার স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধার করবে এবং কে প্রকৃত জালিম ও কে মজলুম তা সনাক্ত করবে। কুরআন মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিতে চায়, কিন্তু তারা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে ভয় পায়। এজন্য তারা তাদের প্রচারযন্ত্র টেলিভিশন ব্যবহার করে যাতে মানুষের মগজ দূষিত ও সঠিক পথে চিন্তার অনুপযোগী হয়ে বধির, মূক ও অন্ধ হয়ে যায়। তখন মানুষ আর জালিমদের দোষ দেখতে পায় না, বরং তারা তাদের বিভিন্ন দলের পক্ষাবলম্বন করে।

এ বইটি মানুষকে টেলিভিশন, মেইন্সট্রিম পত্রিকা ও সংবাদ থেকে বিরত থাকতে বলে যাতে তার মগজধোলাইর মাধ্যমে সূক্ষ্ম চিন্তার ক্ষমতা ধ্বংস না হয়।

এভাবে মুক্তমনা ও সূক্ষ্ম চিন্তার অধিকারী ব্যক্তিগণ কুরআনের সাহায্যে ইসলামের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকৃত জিহাদে অংশ নিতে পারে। “সুতরাং তুমি কাফেরদের আনুগত্য করো না, এবং তুমি কুরআনের সাহায্যে কাফেরদের সাথে কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যাও।” (সূরা ফুরক্বান, ২৫ঃ৫২)

কুরআন মানুষকে এর বক্তব্য অনুধাবন করতে বলে এবং চিন্তাশীলদের অন্তর দ্বারা উপলব্ধি করতে বলে। “এ বরকতময় কিতাব আপনার ওপর এজন্য নাযিল করা হয়েছে যে, যাতে মানুষ এর বক্তব্য অনুধাবন করে এবং এ নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা-ফিকির করে। (সূরা সা’দ, ৩৮ঃ২৯)

এভাবে এটা পরিষ্কার যে, যারা কুরআনের সাথে এরকম হালকা পাতলা বা উদ্দেশ্যহীন সম্পর্ক রাখে যে যখন মন চায় সেখান থেকে কিছু পাঠ করে এটা তাদের কুরআনের প্রতি অবহেলার প্রতীক এবং প্রকৃত অর্থে তারা কুরআনকে বুঝতে পারে না।

তাহলে চিন্তাশীলরা কুরআনকে কিরূপে অধ্যয়ন করবে? এর কি কোন নিয়মভিত্তিক প্রণালী বা মানহায আছে? এ বইয়ে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

(Methodology for the study of the Qura’n বইটির Introduction Chapter এর অনুবাদ – শায়খ ইমরান নযর হোসেন)

কুরআন অনুবাদগ্রন্থ

আমার কাছে একটা বই আছে ঠিক তাফসির নয়, তবে অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত টিকাসহ। আরবী টেক্সট ও বাংলা অর্থ খুবই পরিষ্কার হরফে লেখা। বাইন্ডিং, কাগজ, সাইজ, মলাট সবই সুন্দর। সবচেয়ে উপকার হয় বিষয়সূচী। বিষয়সূচীই হচ্ছে পৌনে দুশ পৃষ্ঠা। বইটি মিরপুর ১৪ এর জামেউল উলুম মাদ্রাসার হুযুররা লিখেছেন। বইয়ের নামঃ আল কুরআনুল কারীম – সহজ বাংলা অনুবাদ ও কুরআনের বিষয়বস্তুর বর্ণভিত্তিক সূচি। প্রাপ্তিস্থানঃ মুফতি মাহবুবুল্লাহ, ভাইস প্রিন্সিপাল, জামেউল উলুম মাদ্রাসা, মিরপুর ১৪ ঢাকা। মোবাইল – ০১৭১৫ ৯৫৪৩১০, ০১৬৮৫ ৯১৯৪৫১, ৮০১৩৯৮৬

মানুষ

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। যতই সেরা হোক জীবের বৈশিষ্ট্য তার আর যায় না। জীব থেকে বের হয়ে মানুষ হয়ে উঠে ক’জন? সূরা আর-রহমানের প্রথমে আল্লাহ বলেন, দয়াময় আল্লাহ। শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষ।

আর রহমান ! আল্লামাল কুরআন !! খালাক্বাল ইনসান !!!

কুরআন শিক্ষার কথা বলেছেন আগে। মানুষ সৃষ্টির কথা বলেছেন পরে। আগে কুরআন শিক্ষা করো তারপর তোমাকে মানুষ বলা যাবে। তা না হলে ‘সেরা জীব’ হয়েই থাকতে হবে।

পূর্বের জুলকারনাইন ছিলেন নবী সুলাইমান (আ)

Quran

কুরআন প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। “আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলমানদের) জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথনির্দেশ, দয়া, ও সুসংবাদস্বরূপ আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। (সূরা নাহল, ১৬ঃ৮৯)। সুবহানআল্লাহ।

 

লিখেছেনঃ Md Arefin Showrav

জুলকারনাইন অর্থ দুই যুগের বিশ্বাসী পরাশক্তি। আগের যুগে জুলকারনাইন ছিলেন নবী সুলাইমান আলাইহিস সালাম।

প্রথমত, জুলকারনাইনকে অবশ্যই ইহুদিদের পরিচিত ও নিকটবর্তী কোন রাজা হতে হবে। এজন্যই ইহুদিরা তাঁর সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত ছিল এবং রাসুল (সা) কে এ ব্যপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর নব্যুয়াতের পরীক্ষা নিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, পবিত্র কোরানে জুলকারনাইনের বর্ণনা এমনভাবে এসেছে যেন জুলকারনাইন আল্লাহতালার সাথে কথাবার্তা আদানপ্রদান করতেন।

অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্তাচলে পৌছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন। [ সুরা কা’হফ: ৮৬ ]
তিনি বললেনঃ যে কেউ সীমালঙ্ঘনকারী হবে আমি তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে ফিরে যাবেন। তিনি তাকে কঠোর শাস্তি দেবেন। [সুরা কা’হফ: ৮৭ ]

অর্থাৎ জুলকারনাইনের উপর ওহী নাযিল হত এবং তিনি আল্লাহর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারতেন। এটা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, জুলকারনাইন নবী-রাসুলদের একজন ছিলেন। অর্থাৎ তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ রাজাও ছিলেন এবং একজন নবীও ছিলেন। তাই কাইরাস, আলেক্সান্ডার এসব নামকে আমরা গারবেজ বিনে ফেলে দিতেই পারি যেহেতু তওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও কোরান– কোন আসমানি কিতাবেই তাদেরকে নবী বলা হয়নি। এখন বলুন, ইহুদিদের পরিচিত ও নিকটবর্তী নবী+ন্যায়পরায়ন রাজা কে? অবশ্যই সুলাইমান (আ)।

তৃতীয়ত, যেহেতু জুলকারনাইন নবী ছিলেন, তাই তাঁর কাঁধে তাঁর কওমকে সত্যের পথে আহবানের দায়িত্ব অর্পিত ছিল। এই মহান ও বিশাল দায়িত্ব থাকায় তিনি বছরের পর বছর সফর করে বেড়াবেন, এটা হতে পারে না। কিন্তু তখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে প্রচুর সময় লাগত যেহেতু দ্রুততর যানবাহন ছিল না। তাই জুলকারনাইনকে অবশ্যই এমন কোন ক্ষমতার অধিকারী হতে হত, যার দ্বারা তিনি সহজেই খুব কম সময়ে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকের স্থানগুলোতে ভ্রমণ করতে পারতেন আর একই সাথে নিজ কওমের প্রতি তাঁর কর্তব্যসমূহও পালন করতে পারতেন। সুলাইমান (আ) এর সেই ক্ষমতা ছিল।

তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হত যেখানে সে পৌছাতে চাইত। [ সুরা সা’দ: ৩৬ ]

চতুর্থত, জুলকারনাইন ইয়াজুজ মাজুজদের আটকাতে পাহাড়ের উচ্চতা সমান দেয়াল নির্মাণ করেন। এতে তিনি লোহার সাথে গলিত তামা ব্যবহার করেন।

তোমরা আমাকে লোহার পাত দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেনঃ তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল, তখন তিনি বললেনঃ তোমরা গলিত তামা নিয়ে এস, আমি তা এর উপরে ঢেলে দেই। [সুরা কা’হফ: ৯৬]

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, লোহা সেখানে মজুদ ছিল। তাই জুলকারনাইন বলেছিলেন, গিভ মি। কিন্তু গলিত তামা সেখানে মজুদ ছিল না। তাই তিনি বলেছিলেন, ব্রিং মি (নিয়ে এসো)। জুলকারনাইন কোথা থেকে নিয়ে আসতে বলছিলেন এই বিপুল পরিমাণ তামা???

আর আমি সোলায়মানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকালে এক মাসের পথ অতিক্রম করত। আমি তার জন্যে গলিত তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম…. [সুরা সা’বা: ১২]

অর্থাৎ সুলাইমান (আ) এর গলিত তামার ঝরণা ছিল!!!
কিন্তু ইজরায়েল থেকে ককেশাস পর্যন্ত এত তামা আনা কীভাবে সম্ভব??? তখন তো এরোপ্লেন ছিল না।
َ
সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? [সুরা নাম’ল: ৩৮ ]
জনৈক দৈত্য-জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত। [সুরা নাম’ল: ৩৯ ]
কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন, এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল। [সুরা নাম’ল: ৪০ ]

এখন প্রশ্ন হলো, এত উঁচু দেয়াল যা শক্তিশালী ইয়াজুজ মাজুজ টপকাতে পারেনি, তা কীভাবে জুলকারনাইন বানালেন আধুনিক কোন প্রযুক্তি ছাড়াই?

আর সকল শয়তানকে তার অধীন করে দিলাম, যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী। [সুরা সা’দ: ৩৭]

জুলকারনাইন পাহাড়ের নিকটবর্তী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কোন খাজনা নেন নি। কারণ তিনি আল্লাহর দেয়া নিয়ামতেই সন্তুষ্ট ছিলেন।

তিনি বললেনঃ আমার পালনকর্তা আমাকে যা দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট…. [সুরা কাহফ: ৯৫]

আর সুলাইমান (আ) ও একইরকম ছিলেন।

অতঃপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাক। [সুরা নাম’ল: ৩৬]

বুঝতে পারছেন কী, দুজন একই ব্যক্তি???

জুলকারনাইন আল্লাহতা’লার কাছ থেকে বে-হিসেব অনুগ্রহ পেয়েছিলেন। জুলকারনাইন যখন পশ্চিমাভিযানে যান, সেখানে আল্লাহতা’লা তাকে কী বলেন?

অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্তাচলে পৌছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে জুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন। [ সুরা কা’হফ: ৮৬]

হযরত সুলাইমান (আ)-ও আল্লাহতালার কাছ থেকে বে-হিসেব অনুগ্রহ লাভ করেন।

এগুলো আমার অনুগ্রহ, অতএব, এগুলো কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও-এর কোন হিসেব দিতে হবে না।
[সুরা সা’দ: ৩৯]

যাবুর কিতাবে উল্লেখ রয়েছেঃ

Psalms 72
David to His son Solomon,
1 Give the king thy judgments, O God, and
thy righteousness unto the king’s son.
2 He shall judge thy people with righteousness, and thy poor with judgment.
3 The mountains shall bring peace to the people, and the little hills, by righteousness.
4 He shall judge the poor of the people, he shall save the children of the needy, and shall break in pieces the oppressor.
5 They shall fear thee as long as the sun and moon endure, throughout all generations.
6 He shall come down like rain upon the mown grass: as showers that water the earth.
7 In his days shall the righteous flourish; and abundance of peace so long as the moon endureth.
8 He shall have dominion also from sea to sea, and from the river unto the ends of the earth.
9 They that dwell in the wilderness shall bow before him; and his enemies shall lick the dust.

যুলকারনাইনের প্রচলিত মতবাদ

Kaisar Ahmed
Kaisar Ahmed নতুন থট। আমি জানতাম সাইরাস দ্য গ্রেট যুলকারনাইন হতে পারে ইতিহাসে সাইরাস ইমান এনেছিল এমন শুনা যায়। দানিয়াল আ ও উযায়ের আ এর পরামর্শে রাজ্য পরিচালনা করতেন আর তাদের পরামর্শেই জেরুজালেমে ইয়াহুদিদের কে ফিরিয়ে আনেন। ইতিহাসেও পাওয়া যায় তিনি ব্ল্যাক সি ও ক্যাস্পিয়ান সি’র দিকে অভিযান করেছিলেন এবং দারিয়াল জর্জ প্রাচীর নির্মাণ করেন।
Ashraf Mahmud
Ashraf Mahmud সাইরাস দ্য গ্রেট যে জুলকারনাইন নন, তা’ আমি পড়েছি। তবে, জুলকারনাইন কে, তা’ কেউই সনাক্ত ও চিহ্নিত করতে পারেনি। তিনি রহস্যময় ও অজ্ঞাত হিসেবে রয়েই গেছেন।
TF Evan জুলকারনাইন সম্পর্কে যতটা জানার দরকার ততটাই আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন । এর বেশি জেনে আমাদের আর কোন লাভ নেই তাই তিনি রহস্যময় ও অজ্ঞাত ।
শীতল নদীর কোলে
শীতল নদীর কোলে আল কোরআনে যে যুলকারনাইনের কথা বলা হচ্ছে তিনি কে ছিলেন, এ বিষয়ে প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজও পর্যন্ত মতবিরোধ চলে আসছে। প্রাচীন যুগের মুফাস্সিরগণ সাধারণত যুলকারনাইন বলতে আলেকজাণ্ডারকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু কুরআনে তাঁর যে গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে, আলেকজাণ্ডারের সাথে তার মিল খুবই কম। আধুনিক যুগে ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর ভিত্তিতে মুফাসসিরগণের অধিকাংশ এ মত পোষণ করেন যে, তিনি ছিলেন ইরানের শাসনকর্তা খুরস তথা খসরু বা সাইরাস। এ মত তুলনামূলকভাবে বেশী যুক্তিগ্রাহ্য। তবুও এখনো পর্যন্ত সঠিক ও নিশ্চিতভাবে কোন ব্যক্তিকে যুলকারনাইন হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারেনি।
Aktar Khan
Aktar Khan কুরআন শরীফের সূরা কাহাফের আয়াত নম্বর ৮৩-১০১ অংশে জুলকারনাইন সম্পর্কিত বর্ণনা আছে। নবী হিসেবে জুলকারনাইনের নাম উল্লেখ নেই যদিও কিন্তু তিনি নবী ছিলেন না এমনটিও বলা হয়নি।

কুরআনের পথে

কুরআনুল কারীমের আজিব বিষয়। পৃথিবীর কোন বিধানপ্রণেতারা তাদের তৈরী করা বিধান তাদের অনুসারীরা পাঠ করলে একটা সিকি পয়সাও দিবে না। আর আল্লাহর প্রণীত বিধান কুরানুল কারীম পাঠ করলে আল্লাহপাক এক এক হরফের বিনিময়ে ১০ টি করে নেকী দান করবেন।

নানা জনে নানা রীতিতে দ্বীনের খেদমত করে। একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন কে বিভ্রান্ত আর কে সর্বাপেক্ষা সঠিক পথে পরিচালিত। কমপক্ষে তিনটি আয়াতে আল্লাহতায়ালা এই বিষয়ে বলেছেন। অথচ কিছু মানুষ নিজ দলকে হক্ব আর নিজ মত ও পথের বিপরীত কিছু দেখলে তাকে ভুল পথ মনে করে।

আমি একজন আলেম, ফক্বিহ, স্কলার এরূপ দাবি করার চেয়ে আমি একজন সাধারণ মুসলমান এ কথা বলা শ্রেয় কারণ তা কুরআনের ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত।

আল্লাহপাক বোঝার তৌফিক দান করুন।

মুতাশাবিহাত আয়াত, সময় ও স্থান এবং আকাশ বা সামাওয়াত

মুতাশাবেহাত আয়াতের অর্থ আল্লাহ জানেন, এবং সেই সাথে গভীর জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরা। জ্ঞানীরা মুহকাম ও মুতাশাবিহাত উভয় ধরনের আয়াতের ওপর ঈমান আনার মাধ্যমে সমগ্র কিতাবের ওপর ঈমান আনতে পারেন। অসৎ আলেমরা মুতাশাবিহাত আয়াতের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পরে। আজকাল মানুষ মনে করে, গভীর জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরাও বোধহয় মুতাশাবিহাত আয়াতের অর্থ জানেন না। (বিস্তারিতঃ ইয়াজুজ মাজুজ – ইমরান নযর হোসেন, পৃঃ ৯১)

সামাওয়াত একটা আকাশের উপরে আরেকটা আকাশ এরকম নয়। বরং সময় ও স্থানের ডাইমেনশন। যেমন আপনি একটা আসমানে আছেন। কিন্তু আপনার কাঁধের দুই ফেরেশতা অন্য আসমানে আছেন। তাদের সময় আপনার সময় থেকে ভিন্ন। তাই আপনি তাদের দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু তারা আপনাকে দেখতে পাচ্ছে। (কার্টেসীঃ Md Arefin Showrav )

আল্লাহ বলেন,

هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ ۗ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ ۗ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ

তিনিই সেই সত্তা যিনি (হে মুহাম্মাদ!) তোমার উপর কিতাব (কুর’আন) নাযিলকরেছেন। এতে রয়েছে মুহকাম আয়াত যা কিতাবের মূল অংশ, সেই সাথে রয়েছে মুতাশাবিহাত আয়াত। এখন যাদের অন্তর সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে তারা কিতাবের তাশাবুহ রূপক অংশের (অপ)ব্যাখ্যার দিকে ধাবিত হয় যা তাদের সংশয় এবং ফিতনাকে প্রকাশ করে দেয়। কিন্তু আল্লাহ, এবং সেই সাথে গভীর জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরা, ব্যতীত এর (মুতাশাবিহাত আয়াতের) ব্যাখ্যা কেউই জানে না। তারা (জ্ঞানীরা) বলে: “আমরা এর প্রতি ঈমান আনলাম; সমগ্র কিতাব (মুহকাম এবং সেই সাথে মুতাশাবিহাত আয়াতসমূহ) আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে”। কিন্তু যাদেরকে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করা হয়েছে তারা ব্যতীত কেউই তা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে না। [আলে ইমরান ৩:০৭]
বিস্তারিত পড়ুন