অঙ্গীকার নেয়ার পর

“যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্নীয়-স্বজন, এতীম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, নামায প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী। যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা পরস্পর খুনাখুনি করবে না এবং নিজেদেরকে দেশ থেকে বহিস্কার করবে না, তখন তোমরা তা স্বীকার করেছিলে এবং তোমরা তার সাক্ষ্য দিচ্ছিলে। অতঃপর তোমরাই পরস্পর খুনাখুনি করছ এবং তোমাদেরই একদলকে তাদের দেশ থেকে বহিস্কার করছ। তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে আক্রমণ করছ। আর যদি তারাই কারও বন্দী হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তবে বিনিময় নিয়ে তাদের মুক্ত করছ। অথচ তাদের বহিস্কার করাও তোমাদের জন্য অবৈধ। তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন। এরাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। অতএব এদের শাস্তি লঘু হবে না এবং এরা সাহায্যও পাবে না।” [আল বাকারা ২: ৮৩-৮৬]

আখেরী জামানার মুসলিমদের হালও কী একইরকম নয়? আল্লাহর ইবাদতের জায়গায় তারা ওয়াশিংটন, প্যারিস, বার্লিনের গ্রিন কার্ডের উপাসনা করে; রাস্ট্রের উপাসনা করে; সংসদের উপাসনা করে; জাতিসংঘের উপাসনা করে। পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার তো দূরের কথা, তাদের হত্যা করতেও পিছপা হয় না, তাদের গায়ে হাত তুলতে পিছপা হয় না, তাদের সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলতে পিছপা হয় না, তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পিছপা হয় না। পান থেকে চুন খসলেই আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। ইয়াতিম ও মিসকিনদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসে না বরং বিনোদনে অর্থসম্পদ খরচ করে ফেলে। মানুষের সাথে সৎব্যবহার না করে তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়া এখন স্বাভাবিক ব্যপার। নামাজ ও যাকাত নিয়মিত আদায় করে না। মুসলিম হয়ে অন্য মুসলিমকে হত্যা করা এখন নিয়মিত ব্যপার। আমেরিকার টাকায় ভুয়া জিহাদ করে প্রতিদিন মুসলিমদের রক্ত ঝরাচ্ছে। ভুয়া জিহাদ করে সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে সেখানকার মুসলিমদেরকে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে ভূমধ্যসাগরের ডুবিয়ে মারছে কিংবা ইউরোপের ভিখারি শরণার্থী বানাচ্ছে। নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে কোন কোন আকিদা পালন করছে আর কোন কোনটি পালন করতে অস্বীকার করছে। এরাই আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়াকে ক্রয় করেছে। কিন্তু এর ফলে এরা দুনিয়ায় যেমন অসম্মানিত হচ্ছে, আখিরাতেও এদের কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

আল্লাহ্‌র কিতাবকে বদলে দেয়ার পরিণাম

মদিনার ইহুদিরা অ-ইহুদিদের বলে বেড়াত যে, “মদিনায় একজন নবী আসবেন। যখন সেই প্রতিশ্রুত একজন আসবেন, তখন তোমাদের দেখে নেব।” কিন্তু যখন রাসুলুল্লাহ (সা) সত্য সত্যই মদিনায় এলেন, তখন ইহুদিরা তাঁর ঘোর বিরোধী হয়ে উঠল। কারণ ইহুদিদের পূর্বপুরুষরা তওরাতের বাক্য পরিবর্তন করে নবী ঈসমাঈল (আ) সম্পর্কে এত খারাপ কথা লিখেছিল যে, কোন আরবকে রাসুল হিসেবে মেনে নেয়া ইহুদিদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তারা আল্লাহর বাণীকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিবর্তন করত। তারা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল করত। যেমনঃ সুদ। আল্লাহ সুদকে হারাম করেছিলেন কিন্তু ইহুদিরা কিতাবের বাক্য বদলে দিয়ে লিখল যে, ইহুদিরা ইহুদিদের সাথে সুদের ব্যবসা করবে না, কিন্তু অ-ইহুদিদের সাথে সুদের ব্যবসা করতে পারে। ইহুদিরা মদকে নিজেদের জন্য হালাল করে নেয় এবং তওরাতে বাক্য পরিবর্তন করে লিখে দেয় যে, নবী নুহ (আ) মদ খেয়েছেন। এভাবে তারা আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তাকে নিজেদের জন্য হালাল করে নেয়। কোন কোন ইহুদি তওরাতে উল্লেখিত রাসুলুল্লাহ (সা) এর ভবিষ্যতবাণী মদিনার মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করত, কিন্তু তারপর যখন ইহুদিরা নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করত, তখন এই জাতীয় ভবিষ্যতবাণীর কথা মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করত। তারা ভেবেছিল, এসব কথা প্রকাশ করে দিলে মুসলিমরা আখিরাতের দিনে তাদের সম্মুখ-তর্কে পরাজিত করবে। আল্লাহ তাদের প্রশ্ন করেছেন যে, তারা কী জানেনা যে গুপ্ত ও প্রকাশিত উভয় কথাই আল্লাহ জানেন?

বনী ইজরায়েলের মধ্যে দুধরনের লোক ছিল। একদল হলো আলেম যারা কিতাবের জ্ঞান রাখত। আরেকদল হলো অশিক্ষিত যারা কিতাবের জ্ঞান রাখত না। আলেমগণ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তওরাতে পরিবর্তন করত, নিজের হাতে লেখা পুস্তককে আল্লাহর বাণী বলে চালিয়ে দিত। এভাবে তারা অনেক হারাম কাজকে হালাল বলে ফতোয়া দিত এবং এ সকল কাজ থেকে ফায়দা লুটত ও অর্থ উপার্জন করত।

অশিক্ষিত লোকেরা অর্থাৎ যাদের কিতাবের জ্ঞান ছিল না, তারা অন্ধভাবে এসব ইহুদি আলেম-ওলামাদের অনুসরণ করত এবং এগুলোকে আল্লাহর আদেশ ভেবে পালন করত। তাদের কিতাব পড়ে দেখার ও যাচাই করার কোন ইচ্ছে ছিল না। হুজুর বলেছে, ব্যস এটাই সত্য ভেবে নিজেদের প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত।

বর্তমান জামানায় মুসলিমদেরও একই হাল। আখেরী জামানার আলেমরা ওয়াশিংটন-লন্ডন-প্যারিসের স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছে। কাগুজে মুদ্রাকে হালাল বলে ফতোয়া দিয়েছে, ইলেকট্রনিক মুদ্রাকে হালাল বলে ফতোয়া দিয়েছে। পশ্চিমা গণতন্ত্রকে হালাল বলে ফতোয়া দিয়ে অসংখ্য ইসলামী রাজনৈতিক দল খুলছে। স্পষ্ট সুদকে লাভ বলে ফতোয়া দিয়ে ইসলামী ব্যাংক খুলছে।

আর আল-কোরানের ব্যপারে অশিক্ষিত মুসলিমরা এসব আলেম-ওলামাদের দেয়া ফতোয়াকে শরীয়তসম্মত ভেবে অনুসরণ করছে। একবারও পবিত্র কোরান খুলে, সহীহ হাদিসগ্রন্থ খুলে পড়ে দেখছে না যে, ইসলামে অর্থের সংজ্ঞা কী, রিবার সংজ্ঞা কী, ইসলামী শাসনতন্ত্রের সংজ্ঞা কী! বরং হুজুরের কথা আপাদমস্তক মেনে নিয়ে তারা তাদের বস্তুগত জীবন নিয়ে পড়ে আছে।
ইহুদিরা যেভাবে ভাবে যে, তারা মাত্র কয়েকদিন জাহান্নামে থাকবে আর তারপর জান্নাতে চলে যাবে; মুসলিমরাও এটা ভাবতে শুরু করেছে যে, কালেমা পড়লেই জান্নাত। যদি আপনি আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল করেন, তাহলে সেটা হয় শিরক। আর যারা আল্লাহর কথা না মেনে হারামকে হালাল করা আলেমদের অনুসরণ করবে, তারাও শিরক করবে। আপনাকে বলতে হবে যে, কাগুজে মুদ্রা হারাম, পশ্চিমা গণতন্ত্র হারাম, রিবা হারাম। কিন্তু আজকাল অধিকাংশ মুসলিম পবিত্র কোরানের জ্ঞান না থাকায় এসব শিরকে লিপ্ত হচ্ছে। এভাবে তারা পাপ দ্বারা নিজেদের পরিবেষ্টিত করে ফেলছে অথচ বলছে, তারা জান্নাতি কারণ তারা মুসলিম! আল্লাহ মুসলিম জাতিকে এই ফিৎনা থেকে রক্ষা করুন ও হালাল-হারাম চেনার সুযোগ করে দিন। (আমিন)

“তোমরা কি আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? তাদের মধ্যে একদল ছিল, যারা আল্লাহর বাণী শ্রবণ করত; অতঃপর বুঝে-শুনে তা পরিবর্তন করে দিত এবং তারা তা অবগত ছিল। যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলেঃ আমরা মুসলমান হয়েছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, তখন বলে, পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তাদের কাছে বলে দিচ্ছ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে পালকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি কর না? তারা কি এতটুকুও জানে না যে, আল্লাহ সেসব বিষয়ও পরিজ্ঞাত যা তারা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে? তোমাদের কিছু লোক নিরক্ষর। তারা মিথ্যা আকাঙ্খা ছাড়া আল্লাহর গ্রন্থের কিছুই জানে না। তাদের কাছে কল্পনা ছাড়া কিছুই নেই। অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে। তারা বলেঃ আগুন আমাদিগকে কখনও স্পর্শ করবে না; কিন্তু গণাগনতি কয়েকদিন। বলে দিনঃ তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোন অঙ্গীকার পেয়েছ যে, আল্লাহ কখনও তার খেলাফ করবেন না-না তোমরা যা জান না, তা আল্লাহর সাথে জুড়ে দিচ্ছ। হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পাপ অর্জন করেছে এবং সে পাপ তাকে পরিবেষ্টিত করে নিয়েছে, তারাই দোযখের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে। পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে।” [আল বাকারা : ৭৫-৮২]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

লোভ নামক গরুকে জবাই করতে বলা হলে অতঃপর …

মিশর ভারতীয় উপমহাদেশের মত কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। তাই সেখানে গরুকে খুব সম্মান করা হত, গরুকে পূজা করা হত। বনী ইজরায়েল মিশরীয়দের সাথে থাকতে থাকতে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং গরুপূজাকে নিজেদের শরীয়তে ঢুকিয়ে নেয়। গরুকে তারা খুব সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করে ও তার পূজাকে যৌক্তিক ভাবতে শুরু করে। তাদের মন থেকে গরুভীতি ও গরুভক্তি দূর করার জন্য আল্লাহপাক তাদের গরু কোরবানি করার নির্দেশ দেন। এটা তাদের খুব মর্মাহত করে। তারা এই নির্দেশ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নানা টালবাহানা শুরু করে ও তাদের রাসুলকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশিত নির্দিষ্ট গরু তারা জবাই করতে বাধ্য হয় যদিও তাদের অন্তর তাতে সায় দেয় না। সেই গরুর ছাই দ্বারা আল্লাহপাক একজন মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন।

আজকের দুনিয়ায় মুসলিমরা পশ্চিমাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সর্বদা ক্ষমতা, অর্থ, নারী, নেশা এবং ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটছে। এগুলোকেই তারা তাদের খোদা বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর ইবাদতের কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। তারা পশ্চিমাদের মত নিজেদেরকে নিজেদের লোভ ও লালসার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এই বিশ্বব্যাপী ফিৎনার যুগে যেখানে তাদের উচিৎ ছিল নিজের ঈমান বাঁচাতে যতটা সম্ভব সহজ সরল জীবনযাপন করা, সেখানে তারা আকাশচুম্বী স্বপ্নে বিভোর যা তাদেরকে ঈমানের দরজা থেকে বহু দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যেসব দেশে আজ ইসলামোফোবিয়া ও ইসলাম নিয়ে চরম মাত্রায় বিদ্বেষ দেখানো হচ্ছে, মুসলিমরা সেসব দেশের অর্থ ও চাকরির লোভে ভিখারির মত সেসব দেশে গিয়েই ঢুকছে। আর যখন সেখানে মসজিদ বন্ধ করা হচ্ছে বা হিজাব নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, তখন তারা বক্সিং গ্লাবস হাতে বের হচ্ছে।

অথচ আখেরী জামানার মুসলিমদের উচিত নিজের লোভ নামক গরুকে জবাই করা এবং কাফেরমুল্লুক থেকে বের হয়ে এমন কোন স্থান খোঁজা যেখানে সে সহজ সরল প্রান্তিক জীবনযাপন করে ও ফিৎনা থেকে দূরে থেকে নিজের ঈমান বজায় রাখতে সক্ষম হবে। তখন তার মৃত হৃদয়কে আল্লাহপাক জীবিত করে দেবেন আর সেই হৃদয় নুর দ্বারা আলোকিত হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “এমন এক সময় আসবে যখন একজন মুসলিমের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সম্পদ হবে ভেড়া যা নিয়ে সে ফিৎনা থেকে নিজের দ্বীনকে রক্ষা করতে পাহাড়ের উপরে এবং বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় পালিয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারি)
কখন একজন মুসলিম এই কাজ করতে পারব? যখন সে তার গরুকে জবাই করবে অর্থাৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতা মুসলিমদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যেভাবে মিশরীয়রা গরুপূজার দ্বারা বনী ইজরায়েলকে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু যখন উচ্চাকাঙ্খী মডারেট মুসলিমদের এই হাদিস শোনানো হয়, তখন তারা নানা টালবাহানা শুরু করে আর অযথা প্রশ্ন করে বিষয়টিকে ঘোলাটে করতে শুরু করে। যেমনঃ কোন পাহাড়ে যাব, বাংলাদেশের কোন পাহাড় নিরাপদ, সব মুসলিম যদি কাজ কর্ম ঘর বাড়ি ফেলে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে চায় এত জায়গা ও খাদ্য পাহাড়ে হবে কী না ইত্যাদি।

বনী ইজরায়েল ভেবেছিল, যদি তারা মিশরীয়দের অনুসরণ করে, তাহলে তারা মিশরীয়দের মত প্রতিপত্তিশীল রাজত্ব লাভ করতে সক্ষম হবে। একইভাবে, আধুনিক সভ্যতায় মুসলিম দেশের জনগণ ভাবে যে, যদি তারা ইউরোপ আমেরিকার শরীয়তের অনুসরণ করে, তাহলে তারা ইউরোপ আমেরিকার মত উন্নত ও অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ রাস্ট্রে পরিণত হতে পারবে। তারা সব সময় পশ্চিমাদের মত বড় বড় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর থেকে আল্লাহকে ভুলে গেছে। তারা বনী ইজরায়েলের মত আল্লাহর নিদর্শন দেখার পরেও তাকে হৃদয়ে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বনী ইজরায়েল দেখেছিল কী করে আল্লাহপাক মৃত ব্যক্তিকে জীবন্ত করেছেন! কিন্তু এই নিদর্শন দেখার পরেও তারা একে নিজ হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি। তাদের হৃদয় আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসেনি। তাদের অন্তরাত্মা আল্লাহর কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পন করেনি।

কারণ তাদের হৃদয় পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে গিয়েছিল। যারা আল্লাহর নিদর্শন দেখার পরেও ভীত হয়না, আল্লাহর দিকে ফিরে আসে না, তাদের হৃদয় পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে। যেসব মুসলিম আখেরি জামানার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছে, বড় বড় আকাশচুম্বী অট্টালিকা দেখতে পাচ্ছে, নারীকে পুরুষের পোশাক পরিহিত ও পুরুষকে নারীর পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে, নারীকে বস্ত্র পরিহিত অবস্থায়ও নগ্নরূপে দেখতে পাচ্ছে, পুরুষে পুরুষে বিবাহ করে ম্যারিজ সার্টিফিকেট হাতে দেখতে পাচ্ছে, সমগ্র বিশ্বব্যাপী হত্যা-খুন-যুদ্ধ ও ফিৎনার ব্যাপকতা দেখতে পাচ্ছে, মাকে সন্তানের দাসীরূপে দেখতে পাচ্ছে, সব জায়গায় রিবার ছড়াছড়ি দেখতে পাচ্ছে অথচ এসব নিদর্শন দেখেও সেইসব মুসলিম যদি নির্বিকারভাবে সমাজের স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে দিয়ে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে রত থাকে, তাহলে অবশ্যই তার হৃদয় ঐসব বনী ইজরায়েলের মত পাথরে পরিণত হয়েছে। পাথর লোহার চেয়েও শক্ত কারণ লোহাও আগুনে বিগলিত হয় কিন্তু পাথর ফেঁটে যাবে, ভেঙে টুকরো টুকরো হবে কিন্তু মাথা নোয়াবে না। এমনকি তাদের হৃদয় কোন কোন ক্ষেত্রে পাথরের চেয়েও কঠিন। কারণ কিছু কিছু পাথর হতেও প্রস্রবণ নির্গত হয় এবং কিছু কিছু পাথর বিদীর্ণ হয়ে তা থেকে পানি নির্গত হয়। তারা আল্লাহর ভয়ে কেঁদে ওঠে। আর কিছু পাথর তো আল্লাহর ভয়ে পতিত হয়ে পাহাড়ধ্বসের সৃষ্টি করে। কিন্তু যারা আল্লাহর নিদর্শন দেখার পরেও নিজেকে পরিবর্তন করে আল্লাহর পথে ফিরে আসে না, নিজের ঈমান রক্ষার চেষ্টা করে না, তাদের হৃদয় পাথরের চেয়েও কঠিন হয়ে যায়।

“যখন মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে বললেনঃ আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাই করতে বলেছেন। তারা বলল, তুমি কি আমাদের সাথে উপহাস করছ? মূসা (আঃ) বললেন, মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তারা বলল, তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, যেন সেটির রূপ বিশ্লেষণ করা হয়। মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলছেন, সেটা হবে একটা গাভী, যা বৃদ্ধ নয় এবং কুমারীও নয়-বার্ধক্য ও যৌবনের মাঝামাঝি বয়সের। এখন আদিষ্ট কাজ করে ফেল। তারা বলল, তোমার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর যে, তার রঙ কিরূপ হবে? মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলেছেন যে, গাঢ় পীতবর্ণের গাভী-যা দর্শকদের চমৎকৃত করবে। তারা বলল, আপনি প্রভুর কাছে প্রার্থনা করুন-তিনি বলে দিন যে, সেটা কিরূপ? কেননা, গরু আমাদের কাছে সাদৃশ্যশীল মনে হয়। ইনশাআল্লাহ এবার আমরা অবশ্যই পথপ্রাপ্ত হব। মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলেন যে, এ গাভী ভূকর্ষণ ও জল সেচনের শ্রমে অভ্যস্ত নয়-হবে নিষ্কলঙ্ক, নিখুঁত। তারা বলল, এবার সঠিক তথ্য এনেছ। অতঃপর তারা সেটা জবাই করল, অথচ জবাই করবে বলে মনে হচ্ছিল না। যখন তোমরা একজনকে হত্যা করে পরে সে সম্পর্কে একে অপরকে অভিযুক্ত করেছিলে। যা তোমরা গোপন করছিলে, তা প্রকাশ করে দেয়া ছিল আল্লাহর অভিপ্রায়। অতঃপর আমি বললামঃ গরুর একটি খন্ড দ্বারা মৃতকে আঘাত কর। এভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শণ সমূহ প্রদর্শন করেন-যাতে তোমরা চিন্তা কর। অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন। পাথরের মধ্যে এমন ও আছে; যা থেকে ঝরণা প্রবাহিত হয়, এমনও আছে, যা বিদীর্ণ হয়, অতঃপর তা থেকে পানি নির্গত হয় এবং এমনও আছে, যা আল্লাহর ভয়ে খসে পড়তে থাকে! আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।” [সুরা বাকারা: ৬৭-৭৪] 

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

ট্যাগঃ বনী ইসরাইল, বনী ইসরায়েল, গরু, গাভী, গরু পূজা, গো-মাতা, গো-মূত্র

দুনিয়ার লোভ মানুষকে বানর করে দেয়

পবিত্র কোরান উপদেশবার্তা স্বরূপ নাযিল হয়েছে। কাদের জন্য? যারা চিন্তা করে। যাদের চিন্তাশক্তি রয়েছে। যাদের চিন্তাশক্তি ৯টা-৫টা অফিস করে, টেলিভিশন দেখে দেখে, বিবাহবহির্ভূত প্রেম করতে করতে ধ্বংস হয়ে গেছে, তারা পবিত্র কোরান থেকে কোন ফায়দা অর্জন করতে পারবে না। যাদের মন সবসময় ইহলৌকিক স্বার্থ হাসিলে নিয়োজিত, তারা বানরে পরিণত হয়েছে। তাদের চোখ আছে কিন্তু সেই চোখ দিয়ে তারা সত্যের প্রকাশ দেখতে পায় না, তাদের কান আছে কিন্তু তারা সেই কান দিয়ে সত্যের বাণী শুনতে পায় না, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা সেই হৃদয় দিয়ে সত্যকে অনুধাবন করতে পারে না। তারা তাদের বস্তুগত জীবনে এতটাই ব্যস্ত যে তাদের আল্লাহর ইবাদত করার সময় নেই, পবিত্র কোরান পাঠ করার সময় নেই।

বনী ইজরায়েল পুরো সপ্তাহের মধ্যে একটিদিনকে বেছে নিয়েছিল ইবাদতের জন্য। শনিবারের এই দিনটিকে বলা হয়, “সাব্বাত”। শর্ত ছিল, এদিন সকল দুনিয়াবি কাজ থেকে বিরত থেকে তাদের আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। কিন্তু তাদের মধ্যে একদল লোক দুনিয়ার লোভে পড়ে এদিন বেশী মাছ ধরার উদ্দেশ্যে মাছের জাল পেতে রাখত। ফলে, তাদের উপর আল্লাহর গজব পতিত হয় ও তারা ঘৃণিত বানরে পরিণত হয়।

অর্থাৎ দুনিয়ার লোভ মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। দাজ্জালের আধুনিক সভ্যতায় দুনিয়াবি লোভ তার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। চারিদিকে ফিৎনা ফ্যাসাদ। মানুষ নৈতিকতা ভুলে গেছে। সবাই শুধু অর্থ কামানোর ধান্দায় ব্যস্ত, বিখ্যাত হওয়ার ধান্দায় ব্যস্ত, ক্ষমতাবান হওয়ার ধান্দায় ব্যস্ত। এসব দুনিয়াবি লোভ মানুষকে আল্লাহর থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, সত্যের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার প্রোপাগান্ডাকে মানুষ সত্য ভেবে ব্রেইনওয়াশড হচ্ছে। ফলস ফ্ল্যাগকে বুঝতে অক্ষম হচ্ছে। জায়োনিস্টরা যেভাবে চালাচ্ছে, এসব ব্রেইনওয়াশড জনতা সেভাবেই চলছে, যেন তারা সার্কাসের বানর!

তাই সত্যের কাছাকাছি আসতে হলে অন্তরে নুরের প্রয়োজন। আর অন্তরকে নুর দ্বারা আলোকিত করতে হলে আল্লাহর দিকে মানুষকে ফিরে আসতে হবে, আল্লাহর ইবাদতের দিকে ফিরে আসতে হবে, আল্লাহর কালামকে অনুধাবন করতে হবে আর দুনিয়ার পূজা ত্যাগ করতে হবে। কারণ আল্লাহই হলেন আল-হক্ব। তিনিই প্রকৃত সত্য। The One True God. সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম এই সত্যই প্রচার করেছেন। তাই দুনিয়াবি লোভে পরে ঘৃণিত বানরে পরিণত হয়ে দাজ্জালের ইশারায় না নেচে আমাদের উচিত আল্লাহর পথে এসে আল্লাহর বাণী ও রাসুলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহ দ্বারা সত্যকে উন্মোচিত করা।

“তোমরা তাদেরকে ভালরূপে জেনেছ, যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘণ করেছিল। আমি বলেছিলামঃ তোমরা লাঞ্ছিত বানর হয়ে যাও। অতঃপর আমি এ ঘটনাকে তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহভীরুদের জন্য উপদেশ গ্রহণের উপাদান করে দিয়েছি।” [সুরা বাকারা ২:৬৫-৬৬]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

আল্লাহ্‌র কিতাব থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার শাস্তি

আল্লাহপাক মানুষকে দুইধরণের দৃষ্টি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একটি হলো বাহ্যিক দৃষ্টি, যার মাধ্যমে মানুষ বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করে। অপরটি হলো আধ্যাত্মিক দৃষ্টি বা হৃদয়ের দৃষ্টি, যার দ্বারা মানুষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করে। জ্ঞানেরও এই দুটি সমুদ্র রয়েছে। একটি হলো বিজ্ঞানের সমুদ্র, অন্যটি হলো আধ্যাত্মিকতার সমুদ্র। এই দুই সমুদ্র যে মোহনায় মিলিত হয়, তাকে বলে মাজমাউল বাহরাইন। যে ব্যক্তির জ্ঞান মাজমাউল বাহরাইনে পৌঁছে, তিনিই হলেন খিজির বা প্রকৃত আলেম।

যে ব্যক্তি বিজ্ঞানের জ্ঞানে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে কিন্তু তার কাছে আধ্যাত্মিক জ্ঞান নেই, সে ব্যক্তি একচোখা, বস্তুবাদী। তাকে প্রকৃত আলেম বলা যাবে না। সে পৃথিবীর রহস্য উন্মোচন করতে ব্যর্থ হবে। সে বুঝতে পারবে না কেন এই রহস্যময় পৃথিবীতে একের পর এক রহস্যজনক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। ছোট্ট ব্রিটেন নামক দ্বীপ কী করে সমগ্র পৃথিবীর বাদশাহী লাভ করল! কী করে পৃথিবীর চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা একটি জাতি তাদের পূর্বপুরুষের দোহাই দিয়ে ইজরায়েল নামক রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা করল আর যারা কথায় কথায় ধর্মকে ইতিহাসের যাদুঘরে পাঠাতে চায় তারাই ইজরায়েল রাস্ট্রের সবচেয়ে বড় সমর্থকে পরিণত হলো! কেন বড় বড় বিশ্বযুদ্ধ সবসময় ইজরায়েলের জন্য লাভবান প্রমাণিত হয়! কেন আজ সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের দখল পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে! বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি কী এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে? পারবে না। সেজন্য লাগবে আধ্যাত্মিক জ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান। লাগবে হৃদয়ের দৃষ্টি।

হৃদয়ের দৃষ্টি বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে হৃদয়ে এমন একটা জিনিস প্রয়োজন যার নাম হলো “নুর”। নুর কাঁচাবাজারেও কিনতে পাওয়া যায় না, শেয়ার বাজারেও পাওয়া যায় না। নুরের বাহক হলো আল-কোরান ও রাসুলুল্লাহ (সা)। আল-কোরান নিয়মিত পাঠ করলে অন্তরে নুর প্রবেশ করবে ও সেই নুর আধ্যাত্মিক দৃষ্টি বা হৃদয়ের দৃষ্টি উন্মোচিত হবে। তখন পাঠক সেই নুর দ্বারা ইতিহাসের দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হবে। পবিত্র কোরানের আয়াতসমূহ হলো আকাশের নক্ষত্রমালার মত। নাবিক যেমন নক্ষত্রমালার ডট মিলিয়ে মিলিয়ে অন্ধকার সমুদ্রে দিক নির্ণয় করতে পারে, পবিত্র কোরান ও সহীহ হাদিস তেমনি ইতিহাসের ডট মিলিয়ে ইতিহাসের গন্তব্য নির্ণয় করতে পারে।

কিন্তু আজকের দুনিয়ায় মুসলমানদের পবিত্র কোরান পাঠ করার ও তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় কোথায়? তারা পবিত্র কোরানকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করছে না যে পবিত্র কোরান মুক্তির পথ দেখাবে। এজন্যই মুসলিমদের মধ্যে হতাশাগ্রস্থদের পরিমাণ দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। কারণ তারা পবিত্র কোরান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহপাক আমাদের এখনো সুযোগ ও সময় দিচ্ছেন, যাতে আমরা এখনই পবিত্র কোরানকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরি। কারণ একবার মালহামা শুরু হয়ে গেলে মালহামা পরবর্তী বিশ্ব হবে মুসলিম জাতির জন্য ভয়াবহ। প্যাক্স জুদাইকা ও প্যাক্স দাজ্জালিকায় ঈমান টিকিয়ে রাখা হবে ভীষণ কঠিন। এখনই তো ঈমান টিকিয়ে রাখা কঠিন, আর তখন হবে আরো অনেক বেশী কঠিন। যাদের পবিত্র কোরানের সাথে সম্পর্ক নেই, সেদিন তারা কোথায় যাবে?

আল্লাহপাক এখনো আমাদের বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করে যাচ্ছেন যাতে আমরা পবিত্র কোরানকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে পারি। আল্লাহপাক বনী ইজরায়েলকেও সুযোগ দিয়েছিলেন। তারা আল্লাহর কিতাবের প্রতি অমনোযোগী হওয়ার পরও তাদের বিনাশ থেকে রক্ষা করেছিলেন।

“আর আমি যখন তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পর্বতকে তোমাদের মাথার উপর তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে, তোমাদিগকে যে কিতাব দেয়া হয়েছে তাকে ধর সুদৃঢ়ভাবে এবং এতে যা কিছু রয়েছে তা মনে রেখো যাতে তোমরা ভয় কর। তারপরেও তোমরা তা থেকে ফিরে গেছ। কাজেই আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবানী যদি তোমাদের উপর না থাকত, তবে অবশ্যই তোমরা ধবংস হয়ে যেতে।” [সুরা বাকারা ২:৬৩-৬৪]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

আহলে কিতাবদের সবাই মনে করে তারাই জান্নাতে যাবে

আল্লাহপাক পৃথিবীতে অসংখ্য নবী রাসুল পাঠিয়েছেন। তাদের সবাই একই সত্য প্রচার করেছেন আর তা হলো আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। সকল নবী রাসুল ইসলামই প্রচার করেছে। আল্লাহপাক চাইলে সবাইকে একজন নবীর উম্মত করে পাঠাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। সে ব্যক্তি মুসলমানই নয় যে, পবিত্র কোরান ব্যতীত অন্য সব আসমানী কিতাবকে ঘৃণা করে। কারণ পবিত্র কোরান পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের স্বত্যায়নকারী ও সংরক্ষণকারী। সে ব্যক্তি মুসলমানই নয় যে ব্যক্তি অন্য নবীর উম্মতকে ঘৃণার চোখে দেখে। অনেক মুসলমান মনে করে যে, শুধুমাত্র তারাই জান্নাতে যাবে। অনেক খ্রিস্টান মনে করে যে, কেবলমাত্র তারাই জান্নাতে যাবে। অনেক ইহুদি মনে করে যে, কেবলমাত্র তারাই জান্নাতে যাবে। কিন্তু একমাত্র আল্লাহপাক নির্ধারণ করবেন কারা জান্নাতে যাবে। ইহুদি, খ্রিস্টান, সাবেঈন ও মুসলমানদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে ও সৎকর্ম করে, তারাই তাদের পালনকর্তার কাছ থেকে পুরস্কারে পুরস্কৃত হবে।

আল্লাহপাক অনেক উম্মত পাঠিয়েছেন। প্রতিটি উম্মতের আলাদা আলাদা শরীয়াহ রয়েছে। আর আখিরাতে আল্লাহপাক মীমাংসা করে দেবেন সেসব বিষয় যেসব বিষয় নিয়ে একদল উম্মত আরেকদল উম্মতের সাথে বিতর্কে লিপ্ত থাকত।

পৃথিবীজুড়ে আমরা যদি আহলে কিতাব ও মুসলিমদের লক্ষ্য করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই, একদল আহলে কিতাব পরষ্পরের সাথে যুক্ত হয়ে বিশ্বময় ফ্যাসাদ ও জুলুম করে বেড়াচ্ছে আর একদল মুসলিম এদের সহযোগিতা করছে। ইউরোপীয় ইহুদি ও পশ্চিমা খ্রিস্টানদের মিলিত এই জায়োনিস্ট জোট অত্যাচার, অনাচার, শিরক ও ধর্মহীনতা ছড়াচ্ছে। ন্যাটোর দ্বারা বিশ্বময় যুদ্ধ বিগ্রহ ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। একদল মুসলিম তাদের সহযোগিতা করছে ও মিথ্যে জিহাদ করে ইসলামের নাম খারাপ করছে। এদের বিপরীতে একদল খ্রিস্টান রয়েছে যারা এসব জুলুমের বিরোধীতা করছে, ন্যাটোর সর্বভুক পলিসির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। একদল ইহুদি রয়েছে যারা ফিলিস্তিনিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইজরায়েল রাস্ট্রের বিরোধীতা করছে। একদল মুসলিম রয়েছে যারা মিথ্যে জিহাদ ও জায়োনিস্টদের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত আছে। এরাই হলো সেইসব লোক যারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবে।

“নিঃসন্দেহে যারা মুসলমান হয়েছে এবং যারা ইহুদী, নাসারা ও সাবেঈন, (তাদের সবার মধ্য থেকে) যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তার সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।” [সুরা বাকারা ২:৬২]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

বনী ইসরায়েল ও মুসলমানদের দাসত্বের জীবনের প্রতি অনুরাগ

বনী ইজরায়েল মিশরে দাসত্ব করতে করতে ভুলে গিয়েছিল স্বাধীনতা কাকে বলে। তারা সারাদিন গাধার মত ফেরাউনের জমিতে কৃষিকাজ করাকেই বিরাট সম্মানজনক ক্যারিয়ার ভাবত। আল্লাহপাক যখন তাদেরকে স্বাধীন জীবন দান করলেন আর মান্না ও সালওয়াকে তাদের খাদ্য হিসেবে পাঠালেন, তারা এই স্বাধীন জীবনযাপনে সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের চোখে আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী জীবনযাপনের চেয়ে ফেরাউনের শরীয়ত অনুযায়ী জীবনযাপনই বেশী আকর্ষণীয় ছিল। তারা স্বাধীনতাকে ছেড়ে গোলামির জীবনযাপনের প্রতি বেশী আকৃষ্ট হয়েছিল।

বর্তমান দাজ্জালের নির্মিত আধুনিক সভ্যতায় মুসলমানরাও স্বাধীন জীবনযাপন ত্যাগ করে গোলামির জীবনযাপনের প্রতি বেশী আকৃষ্ট হচ্ছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে ভালো চাকর হয়ে সম্মানজনক চাকরির আশায়। ৯টা থেকে ৫টার কর্পোরেট জীবন মুসলিমদের চিন্তাশক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তাকে টাকার পূজারি বানিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বে কী ঘটছে, কেন ঘটছে তা বোঝার আগ্রহ মুসলিমরা হারিয়ে ফেলেছে। দিনরাত টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে, ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে, প্রতিযোগিতা করতে করতে মুসলমান জাতি দাজ্জালের দ্বারা ব্রেইনওয়াশড হয়ে গেছে। তাদের কাছে এটাই গৌরবের জীবন। যদি এখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা যা করছ তা গোলামী, তবে তারা তাকে কৌতুক ভেবে হাসবে। কারণ তারা গোলামির জীবনকেই সম্মানজনক ক্যারিয়ার ভাবছে।

বনী ইজরায়েল আল্লাহর শরীয়তকে ছেড়ে যখন অন্য শরীয়ত গ্রহণ করে, তাদের চোখে যখন আল্লাহর আয়াতের থেকে মানবসৃষ্ট জিনিস বেশী আকর্ষণীয় লাগে, তখন যারা আল্লাহর কথা বলে, আল্লাহর নিদর্শনের কথা বলে, আল্লাহর শরীয়তের কথা বলে, সেসব নবীদের তারা ঘৃণা করতে থাকে ও তাদের অত্যাচার নির্যাতন এমনকি হত্যাও করতে থাকে। আমরা যদি বর্তমান আধুনিক সভ্যতার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, পৃথিবীর সব দেশে ইউরোপীয় শরীয়ত চলছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন-আদালত, সংস্কৃতি সব কিছুতেই ইউরোপীয়দের শরীয়ত। মুসলিম দেশগুলোতেও একই হাল। এটাই নাকি সভ্যতা! যদি কেউ এই শরীয়তের বিরোধিতা করে আর আল্লাহর দেয়া শরীয়ত কায়েম করতে বলা হয়, তবে তাকে জঙ্গি, মৌলবাদী, দেশদ্রোহী ট্যাগ দেয়া হয় এবং তার উপর নির্যাতনের খরগ নেমে আসে। বিশ্বের নানা প্রান্তে অসংখ্য আলেম-ওলামাকে হত্যা করা হয়েছে আল্লাহর শরীয়ত কায়েম করার কথা বলায়। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার হাত আলেম-ওলামাদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে রয়েছে।

বনী ইজরায়েল নবী জাকারিয়া (আ) কে মসজিদের ভেতর হত্যা করেছিল। তাঁর ছেলে নবী ইয়াহিয়া (আ) কে প্রতারণার মিথ্যে অভিযোগে হত্যা করেছিল। নবী ঈসা (আ) নবীদের এই হত্যাকান্ড সম্বন্ধে কথা বলেছেন এবং এই জঘন্য অপরাধের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি তাঁর সুর মোটেই নরম করেন নি।

” এইজন্য বিধাতা তাঁর উদ্দেশ্য অনুসারে এই কথা বলেছেন, ‘আমি তাদের কাছে নবী ও রাসুলদের পাঠিয়ে দেব। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে তারা হত্যা করবে এবং অন্যদের উপর জুলুম করবে।’ এর ফল হলো, দুনিয়া সৃষ্টির সময় থেকে শুরু করে যতজন নবীকে খুন করা হয়েছে, তাদের রক্তের দায়ী হবে এই কালের লোকেরা (অর্থাৎ ইহুদীদের এই প্রজন্ম, অন্যকথায় ঈসা (আ) এর সময়কার প্রজন্ম)। জ্বী, আমি আপনাদের বলছি, হাবিলের খুন থেকে শুরু করে যে জাকারিয়াকে কোরবানগাহ ও পবিত্র স্থানের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল, সেই জাকারিয়ার খুন পর্যন্ত সমস্ত রক্তের দায়ী হবে এই কালের লোকেরা।” [ ইঞ্জীল, লূক ১১: ৪৯-৫১]
সর্বশেষ, তারা এ নিয়ে গর্ববোধ করেছে যে, কীভাবে তারা মসীহ ঈসা (আ) কে হত্যা করেছে [কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করেন]।

বনী ইজরায়েলের এই পাপাচারের জন্য আল্লাহপাক তাদের শাস্তি দেন। সেনাপতি টাইটাসের নেতৃত্বে রোমান বাহিনী ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম অবরোধ করে। টাইটাস জেরুজালেম শহর ধ্বংস করে দেন, এর বাসিন্দাদের হত্যা করেন এবং পবিত্রভূমি থেকে অবশিষ্ট ইহুদীদের বহিষ্কার করেন।

আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতাও আলেম-ওলামাদের রক্তে নিজেদের রাঙিয়েছে ও আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করেছে। তাই এর উপরও আল্লাহর গজব আপতিত হবে। মালহামা বা পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবে।

“আর তোমরা যখন বললে, হে মূসা, আমরা একই ধরনের খাদ্য-দ্রব্যে কখনও ধৈর্য্যধারণ করব না। কাজেই তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট আমাদের পক্ষে প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের জন্যে এমন বস্তুসামগ্রী দান করেন যা জমিতে উৎপন্ন হয়, তরকারী, কাকড়ী, গম, মসুরি, পেঁয়াজ প্রভৃতি। মূসা (আঃ) বললেন, তোমরা কি এমন বস্তু নিতে চাও যা নিকৃষ্ট সে বস্তুর পরিবর্তে যা উত্তম? তোমরা কোন নগরীতে উপনীত হও, তাহলেই পাবে যা তোমরা কামনা করছ। আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হলো এ জন্য যে, তারা আল্লাহর বিধি বিধান মানতো না এবং নবীগনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান সীমালংঘকারী।” [সুরা বাকারাঃ ৬১]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা