মিথ্যাচার

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াতের মধ্যে আল্লাহতায়ালা দাজ্জালী বাহিনী তথা ইহুদী খ্রিস্টান জোটের মিথ্যাচারকে উল্লেখ করেছেন। তারা বড় বড় মিথ্যার জালে মানুষকে আটকে ফেলে। যেমন তারা বলে, আল্লাহর একটি পুত্র সন্তান আছে। এখানে ইঙ্গিত রয়েছে এভাবে দাজ্জাল মানবতাকে বড় বড় মিথ্যার ফাঁদে ফেলবে।

যেমন তার সহকর্মীরা শুনাবে যে, ইরাকের কাছে গণ-বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে। ইরান একটি পারমাণবিক হুমকি। আরব ও মুসলিমরা ৯/১১ আক্রমণের জন্য দায়ী। মাদ্রাসা মসজিদে জঙ্গী তৈরী হয়। নারী জাগরণের মাধ্যমে নারীদের প্রকৃত উন্নতি হয়। সুদ ছাড়া অর্থনীতি অচল। গণতন্ত্রের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মুক্তি।

ফলে সত্যকে ধ্বংস করার পথ তৈরী হয়। উদাহরণস্বরূপ, নারী জাগরণের কথা বলে নারীদের পর্দার অধিকারকে বাধাগ্রস্থ করা হয়।

এবং মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করা হয়।

এখানে একটি অতিরিক্ত বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। ইরাকে আক্রমণের পর তারা দু’টি জিনিস পায়নি। এক, মারণাস্ত্র; দুই, সাদ্দামের দুর্নীতি। যদি এ’ দুটির একটিকেও তারা পেত তাহলে ইরাক আক্রমণকে জায়েয করে ফেলত। যদিও প্রথমদিকে তারা সাদ্দামের সোনার টয়লেট এবং বিলাসবহুল জীবনের প্রচারণা ছড়িয়েছে। বাইতুল্লাহর মুসাফির গ্রন্থে লেখক সাদ্দামের বাসভবনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেছেন এবং তার সাধাসিধা জীবনযাপনকে তুলে ধরেছেন, যদিও রাষ্ট্র পরিচালনায় সাদ্দাম দ্বীনী আদর্শ বাদ দিয়ে পাশ্চাত্য সেক্যুলার নীতিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

সূরা কাহাফ এবং ব্রেক্সিট

Surah Kahf and Brexit

Read Surah Kahf to understand the present scenario

সূরা কাহাফ আমাদের কাছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি ঘৃণ্য যুদ্ধের কাহিনীর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে যার ফলশ্রুতিতে সাতজন যুবক নিজেদের ঈমান রক্ষার্থে ঐ ক্ষয়িষ্ণু সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আল্লাহতায়ালা তাদের ঘুমন্ত সময়গুলোতেও মানুষের অন্তর তাদের প্রতি আতঙ্কগ্রস্থ করে রাখেন।

আজ আমরা দেখছি বৃটিশ আমেরিকা জোট ইসলামের বিরুদ্ধে সেই একই ঘৃণ্য যুদ্ধের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে খেলাফতকে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং ইহুদীদের জন্য পবিত্রভূমির অবৈধ দখলকে বৈধতা দান করেছে। যার ফলে চলমান প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা থেকে মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সমাজব্যবস্থায় মুসলমানদের এ শূন্যতাকে ঢাকার জন্য / প্রক্সি দেয়ার জন্য অনেকগুলো যায়োনিস্ট মুসলিম রাষ্ট্র তৈরী করা হয় যাদেরকে ‘মুসলিম বিশ্ব’ নাম দেয়া হয়। প্রকৃত মুসলমানরা সমাজের মূলধারা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার পরও আশ্চর্যজনকভাবে আল্লাহতায়ালা মানুষের অন্তর তাদের প্রতি আতঙ্কগ্রস্থ করে রাখেন।

সূরা কাহাফের ঐ সাত যুবক যখন দীর্ঘ ঘুম থেকে জাগ্রত হন ততদিনে ইসলামের প্রতি তৎকালীন যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং ঐ অঞ্চল মুসলমানদের জন্য নিরাপদ হয়েছে। এমনকি ঐ অঞ্চলের মানুষেরা তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

আজকে ব্রেক্সিটের মাধ্যমে একটি সন্ত্রাসী সমাজের বিচ্ছিন্নতা মুসলমানদের দীর্ঘ ঘুমের শেষ দিকের সময়গুলোকে ইঙ্গিত করছে। মুসলমানরা যখন জেগে উঠবে ততদিনে ঐ সন্ত্রাসী সমাজ যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর যুদ্ধ করেছিল তারা ধ্বংসাবশেষে পরিণত হবে। তাদের আজকের মুদ্রাগুলোও অকেজো হয়ে যাবে। (তাদের রাজা রানী বাদশাহদের ছবি অঙ্কিত) ডলার পাউন্ড স্টারলিং ইউরো রিয়াল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। যেমনভাবে সূরা কাহাফের ঐ সাত যুবক ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর তাদের কাছে সংরক্ষিত তৎকালীন ফটকা মুদ্রাগুলো ততদিনে অচল হয়ে গিয়েছিল (এবং প্রকৃত মুদ্রাব্যবস্থার যুগ ফিরে এসেছিল)।

জগতসমূহের বিবর্তনের প্রকৃত ধারণা (এবং সত্যস্বপ্ন)

Baitul Maqdis

আল্লাহর সৃষ্টিজগতের সবকিছু বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টির অন্য সবকিছুর মত সময়েরও বিবর্তন হয়েছে, এবং তার মধ্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

সৃষ্টির শুরু হয়েছিল একটি ‘কুন’ বা ‘হয়ে যা’ শব্দ দিয়ে, অতএব বিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন সৃষ্টি বিভিন্ন পর্যায় ও বিভিন্ন জগতে আবির্ভূত হয়। সৃষ্টিগজতের সবকিছুর সাথে সময়েরও বিবর্তন হয়, এবং তার মধ্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়। এভাবে আল্লাহ স্থান ও সময়ের সাতটি ভিন্ন ভিন্ন জগত সৃষ্টি করেন। অন্য সমস্ত সৃষ্টবস্তু যার যার পরিচিত স্থান ও সময়ে স্থিত হয়।

সৃষ্টজগতের বিবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হয় এক কুদরতী আদেশ তথা ‘কুন’ শব্দের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা এর বিকৃত নাম দিতে পারেন বিগ ব্যাং, কিন্তু তা ‘কুন’ শব্দের বলিষ্ঠ ধ্বনিকে কিছুমাত্র হ্রাস করবে না।

“তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন তখন সেটিকে এ কথাই বলেন, ‘হয়ে যাও!’ তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়।” (সূরা বাকারা, ১১৭)

হাদীস থেকে জানা যায় ‘প্রথম সৃষ্ট আলোর’ কথা যাকে সকল সৃষ্টির উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জাবির রাযিআল্লাহু তায়ালা য়ানহু থেকে বর্ণিত, “আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে জানিয়ে দিন আল্লাহ কোন জিনিসটি অন্য সবকিছুর আগে সৃষ্টি করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, মহান আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সৃষ্টি করার আগে নিজের নূর থেকে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন।” শায়খ ইমরান নযর হোসেনের মতে এটিই সৃষ্টির প্রথম পর্যায়।

সৃষ্টির প্রথম পর্যায়কে শায়খ সূক্ষ্ম অস্তিত্বের পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, অর্থাৎ যা বস্তুর মত স্থূল নয়, বরং যা স্থানহীন ও সময়হীন। সৃষ্টির সেই সূক্ষ্ম অস্তিত্বের পর্যায়ে আল্লাহপাক মানুষ ও নবীদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। (দ্রঃ সূরা আ’রাফ, ৭ঃ১৭২) ও (দ্রঃ সূরা আল ইমরান, ৩ঃ৮১)

অতঃপর স্থান ও সময়ের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় কোন এক আলোর জগতে ফেরেশতা সৃষ্টি হয়। এভাবে আগুনের জগতে জ্বীন জাতির সৃষ্টি হয় এবং মাটি, পানি ও আলো-হাওয়ার জগতে মানব, প্রানী ও উদ্ভিদকূলের সৃষ্টি হয়।

বিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় পূর্ববর্তী সৃষ্টির তুলনায় পরবর্তী সৃষ্টি সূক্ষ্মতা, পরিমার্জন, অস্পৃশ্যতা এবং গুণসম্পন্নতার দিক দিয়ে ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। পক্ষান্তরে প্রগতির ধারায় পরবর্তী সৃষ্টির স্থূলতা, অনুভবযোগ্যতা, ভিন্নতা এবং পরিমাপযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এটাই হচ্ছে সৃষ্টজগতের মধ্যে এক জিনিস থেকে আর এক জিনিসের উৎপত্তি, বা ‘হয়ে যাওয়া।’ এই প্রক্রিয়া সদা সর্বদাই বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর সৃষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

কিন্তু তা কখনোই র‍্যান্ডমলি বা স্বাধীনভাবে হয় না। কারণ সৃষ্টিজগত শুধু আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নাম আল-খালিক্বের মুখাপেক্ষী নয়, বরং আল্লাহ তায়ালার আর দু’টি গুণবাচক নাম আর-রব্ব ও আর-রাজ্জাকের মুখাপেক্ষী। আর-রব্বের অর্থ পালক, রক্ষক, পরিবর্ধক ইত্যাদি। আর-রাজ্জাক অর্থ রিযিকদাতা।

কোন জাতি ও বস্তুকে আল্লাহ কি পরিমাণ বিকশিত করবেন এবং তাকে কিভাবে সৃষ্টিজগতে প্রতিপালন করবেন তার মাত্রা নির্দিষ্ট করা আছে।

“আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা (পরিমাপ) ।” (সূরা তালাক্ব, ৬৫ঃ৩)

এর মধ্যে রয়েছে সময়েরও বিবর্তন ও মাত্রা যার বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন সৃষ্টি পূর্ণতা পেয়েছে। কুরআন সাতটি ভিন্ন আকাশের অস্তিস্ত্বের কথা বলেছে যা একে অন্যের পাশাপাশি অবস্থান করে, এবং এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে সময়েরও সাতটি মাত্রা রয়েছে, যার ভেতর দিয়ে দুই দিকেই গমনাগমন করা যায়, এবং এর প্রত্যেকটিই পৃথিবীর জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

“তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফেরাও, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” (সূরা মূলক, ৬৭ঃ৩)

সময় ও স্থানের বিভিন্ন মাত্রার ভেতর দিয়ে মানুষের বিবর্তন ঘটেছে। পরিশেষে সে এই পৃথিবীতে এসে হাজির হয়েছে। ইতিমধ্যে সময় ও স্থানের কোন এক মাত্রায় তাকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে আল্লাহর একত্ববাদের অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হয়েছিল। (দ্রঃ সূরা আ’রাফ, ৭ঃ১৭২)। আবার অচিরেই মানুষ মৃত্যূ, কবর, হাশর, পুলসিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদির মাধ্যমে সময় ও স্থানের অন্য মাত্রায় আরোহণ করবে।

“আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লাল আভার; এবং রাত্রির, আর তাতে যা কিছুর সমাবেশ ঘটে তার, যখন তা’ পূর্ণরূপ লাভ করে। নিশ্চয়ই তোমরা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে আরোহণ করবে।” (সূরা ইনশিক্বাক্ব, ৮৪ঃ১৬-১৯)।

সত্যস্বপ্ন বা ধর্মীয় ভাববাণী (Prophecy) স্থান ও সময়ের বিভিন্ন মাত্রার বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে। সত্যস্বপ্নের দৃশ্যগুলি এমন ঘটনা যা বিবর্তনের মাধ্যমে এখনো বিভিন্ন জগত পার হচ্ছে। সত্যস্বপ্ন অদৃশ্য জগতের বাস্তবতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সরবরাহ করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সালাম বলেছেন, সত্যস্বপ্ন (এবং সেই সাথে আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি) নবুয়ত শেষ হবার পরেও থাকবে।

“যখন কেয়ামতের সময় নিকটবর্তী হবে, তখন মু’মিনদের স্বপ্ন খুব কমই ব্যর্থ হবে; বিশ্বাসীদের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।”

স্বপ্ন সত্যে পরিণত হবার কারণ এই যে, ঘটে যাবার আগেই সেগুলো অস্তিমান ছিল। আমরা আগেই জেনেছি, কোন ঘটনার সৃষ্টি প্রক্রিয়া শুরু হয় আল্লাহর কুদরতি আদেশ ‘কুন’ থেকে। তারপর সেটা সময় ও স্থানের বিভিন স্তর পেরিয়ে বস্তুজগতে প্রকাশ পায় বা সংঘঠিত হয়। পৃথিবীতে ঘটে যাবার আগেই যখন সেটি আধ্যাত্মিক গোচরে আসে, তাকে সত্য স্বপ্ন বলা হয়।

সময় ও স্থানের বিভিন্ন মাত্রাকে আকাশ বা সামাওয়াত বলা হয়। এটি পরিষ্কার যে, আমরা সেই মিলনস্থল নির্ধারণ করতে পারি না, যেখানে প্রথম আকাশ বা স্তর শেষ হয়েছে আর দ্বিতীয় আকাশ বা স্তর শুরু হয়েছে। কারণ আকাশগুলি এমন নয় যে তা লম্বভাবে একে অপরের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বরং প্রতিটি আকাশ নিজস্ব মাত্রা বজায় রেখে একটি অপরটির সাথে মিশে রয়েছে। এজন্যই মানুষ যখন সিজদায় যায় তার আর আল্লাহর মাঝে আর কোন দূরত্বগত বাঁধা থাকে না। অথবা মানুষ যখন শহীদ হয় মৃত্যুর পূর্বেই তার কাছে জান্নাতের জগত এনে হাজির করা হয়। সে দুনিয়ায় থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পায়।

কিভাবে আলাহ তায়ালা সাতটি আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন এ ব্যাখ্যার মধ্যে নিহিত আছে আল্লাহ যে সর্বত্র বিরাজমান এ বিতর্কের অবসান। আল্লাহপাক তার আরশে সমাসীন কিন্তু সেই আরশ হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে নয়। বরং আমাদের ঘাড়ের শাহ ধমনীর থেকেও নিকটে। কিন্তু তাঁর ও আমাদের মধ্যে আছে সাতটি আকাশের আপাত অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব।

ঠিক যেমন আমল নামা লেখার সম্মানিত ফেরশতা কিরামান কাতিবীন আমাদের দু’ঘাড়ে অবস্থান করেও কিন্তু আমাদের আকাশ বা সামা’তে নয় বরং স্থান ও সময়ের অন্য মাত্রায় অবস্থানরত।

অতএব এক আকাশ থেকে আরেক আকাশে প্রবেশ করার জন্য মহাকাশ যানের সাহায্যে হাজার হাজার আলোকবর্ষ ভ্রমণ করার প্রয়োজন নেই। যে কোন মুহূর্তে এক মাত্রা থেকে বেরিয়ে অন্য মাত্রায় প্রবেশ করা যায়। একাজ করার জন্য কোন কর্মচাঞ্চল্যের প্রয়োজন নেই, অর্থাৎ সময় ও স্থানের ভেতর নড়াচড়ারও প্রয়োজন নেই।

এখানেই পাওয়া যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সালামের ইসরা ও মি’রাজের অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা, যখন তিনি মক্কা হতে জেরুজালেম পর্যন্ত এবং তারপরে সপ্তাকাশের ভিন্ন ভিন্ন সময় ও স্থানের মাত্রার ভেতর দিয়ে আরোহণ করে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে ঈসা য়ালাইহিস সালামের আসমানে আরোহণ, এবং দাজ্জালের এক দিন সমান এক বৎসর, এক দিন সমান এক মাস ও এক দিন সমান এক সপ্তাহ ভিন্ন স্থান ও সময়ের মাত্রায় কাটিয়ে আমাদের পরিচিত স্থান ও সময়ের মাত্রায় এক দিন সমান এক দিনে ফিরে আসা।

হতে পারে দাজ্জালের এক বৎসর পৃথিবীর প্রায় সাতশ বছরের সমান যা প্যাক্স ব্রিটেনিকা নামে পরিচিত। আবার তার এক মাস পৃথিবীর প্রায় ৭০-৮০ বৎসরের সমান যা প্যাক্স আমেরিকানা নামে পরিচিত। আমরা অপেক্ষায় আছি দশ বিশ বছরের প্যাক্স জুদাইকার যা হবে পৃথিবীর ভয়ঙ্কর যুদ্ধের ফিতনার দিন।

ইসলাম স্থান ও সময়ের বিবর্তনকে ঠিক ঠিক ব্যাখ্যা করে যার মধ্যে নিহিত আছে হেকমত বা প্রকৃত বিজ্ঞান। এটা বুঝার জন্য প্রয়োজন ঈমান। ডারউইনবাদ বা নাসার মহাকাশ বিজ্ঞান অথবা ইউরোপ আমেরিকার সেক্যুলার সায়েন্টিফিক জ্ঞান দ্বারা তার কিছুই বুঝা যাবে না।

আল্লাহু য়ালাম।

(শায়খ ইমরান নযর হোসেনের ‘সূরা কাহাফ এবং বর্তমান বিশ্ব’ এবং ‘পবিত্র কুরআনে জেরুজালেম’ গ্রন্থ অবলম্বনে)

জীবনের ভুল বসন্ত

সূরা কাহাফ শেষ যুগ বিষয়ক সূরা। এ সূরায় শেষ যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ সূরার আলোকে নিজের জীবন ও চারপাশের পরিবেশ দেখে নেয়ার সুযোগ আছে। আমার ফেলে আসা পেছনের দিনগুলো কেমন ছিল?

আমি যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাসায় আমার নানার ব্যবহৃত কিছু দ্রব্যসামগ্রী তখনও ছিল যিনি গত হয়েছিলেন স্বাধীনতার কয়েক দশক পূর্বে। একটি পেতলের কলসে আমার নানার নাম লেখা ছিল। আর ছিল একটি পেতলের ময়ূরের পানদানি। বুঝা যায় ভদ্রলোক সৌখিন ছিলেন। এ লেখাটি লেখতে গিয়ে সেই কলস ও পানদানির কথা মনে পড়ল। সেগুলো এখন কোথায় আছে আমার জানা নেই। আমাদের বাসায়ই তো ছিল। এরপর অনেকবার বাসা বদল, লেখাপড়ার জন্য হোস্টেলে থাকা, নিজের সংসার হওয়া, সেখানে নতুন বংশধর আসা – এতো এতো ঘটনায় সে কলস ও পানদানি যে কোন ধুলোর মধ্যে মিশে গেছে কেউ খবর রাখেনি।

ইতিমধ্যে আমার বাবাও গত হয়েছেন কয়েক বছর হল। তারও একটি সংসার ছিল, বন্ধুবান্ধব ছিল, ব্যবসা ছিল, মেট্রিকের সার্টিফিকেট ছিল। আমরা একসাথে খেতে বসতাম, একসাথে জীবন যাপন করতাম। কিন্তু কিছু মাটির দলাকে বুনো বাতাস যেমন তার অংশগুলোকে ভেঙ্গে গুড়ো করে দূরে উড়িয়ে নিয়ে যায়, আমার বাবার সংসারের সবকিছুই তেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। দিন যায়, মাস যায় তবুও জীবনের বাস্তবতায় আমাদের ভাইবোনদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগও হয় না।

একদিন আমারও শৈশব ছিল, শৈশবের মধুর দিন ছিল, মামার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ছিল, এসএসসি পরীক্ষা ছিল, নতুন বইয়ের গন্ধের ভালো লাগা ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। জীবনের প্রতিটি দিন এসেছে সবুজ হয়ে আর ঝরে গেছে ধুলো হয়ে। সেই সবুজ আসলে ছিল ফলস সবুজ আর ধুলোটাই হয়েছে সত্যি।

সূরা কাহাফ এই বাস্তবতাকে তুলে ধরার মাধ্যমে শেষ যুগের অনুসন্ধানী মানুষদের চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ করে দিয়েছে। যাতে তারা দাজ্জালের রঙ্গীন পৃথিবীর মোহে ঈমান ও আমলের মূল্যবান সঞ্চয়ের সময়টাকে নষ্ট হতে না দেয়।

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াতের মধ্যে আমাদের এই বিষয়ে বুনিয়াদী শিক্ষা দেয়া হয় যা দাজ্জালের বস্তুগত আক্রমণের বিপরীতে আধ্যত্মিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

“আমি পৃথিবীস্থ সব কিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে। এবং এর উপর যা কিছু রয়েছে তা অবশ্যই আমি উদ্ভিদশূন্য মাটিতে পরিণত করব।” (সূরা কাহাফ, ৭-৮)

এভাবে সূরা কাহাফ পৃথিবীর ক্ষণস্থায়িত্ব ও তার অসারতার কথা বর্ণনা করে। দাজ্জাল মানুষের কাছে পৃথিবীকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে, কিন্তু দিনশেষে তা ধুলার পাত্রে পরিণত হয়।

এটা সেই পরীক্ষার খাতার মতো যা অনেক সুন্দর ও চকচকে থাকে কিন্তু পরীক্ষার পর তা ময়লার স্তূপে পরিণত হয়। আসল লাভবান সে-ই যে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় মার্ক সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া ওই খাতাটির আর কোন মূল্য নেই সেটা যতই দামি ও সুন্দর হোক না কেন।

“তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। এটা পানির ন্যায় যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি। অতঃপর এর সংমিশ্রণে শ্যামল সবুজ ভূমিজ লতাপাতা নির্গত হয়; অতঃপর তা শুকিয়ে এমনভাবে গুঁড়ো হয়ে যায় যে, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ এসব কিছুর উপর শক্তিমান। ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা, তবে তোমার প্রতিপালকের নিকট সৎকর্মের ফল হবে স্থায়ী, এবং এই আশ্বাসের মধ্যেই রয়েছে প্রতিদানের সকল আশা।” (সূরা কাহাফ, ৪৫-৪৬)

পৃথিবীর মায়াময় মাটিতেই যে জিনিস মূল্য হারিয়ে অচিরেই মাটির দলার মতো হয়ে যায়, আখিরাতের সেই সঙ্কুল দিনে এর কি মূল্য থাকতে পারে !

Spring-is-Here

The False Spring of Life

যারা কুরআনের নতুন আনীত ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারেন না

Sea and Ink

যারা কুরআনের নতুন আনীত ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারেন না। সূরা কাহাফে শেষ যুগ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে একথা সর্বজনবিদিত। এখানে ইয়াজুজ মাজুজের প্রসঙ্গ সরাসরি এসেছে, পুরো সূরায় দাজ্জালের নাম কৌশলগত কারণে উল্লেখ না করে সূরাটি ইসলামের বিরুদ্ধে দাজ্জালের ভয়াবহ যুদ্ধকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে। এবং এ যুদ্ধে মুসলমানদের জয়ী হওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

কাজেই যখন আমরা বলি ইয়াজুজ মাজুজ প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে মুক্তি পেয়েছে, ইসলামের বিরুদ্ধে দাজ্জালের নিষ্ঠুরতম যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তারপরও অনেক ভাই বলেন, এসব ব্যাখ্যা আপনারা কোথায় পান? সালাফরাতো এ সূরার এরকম ব্যাখ্যা করেন নাই। বা এ ব্যাখ্যা তো অমুক অমুক তাফসীরের কিতাবে নাই।

তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয় কুরআনের সমস্ত ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে, এর আর কোন ব্যাখ্যা বাকী নেই। কিন্তু বাস্তবতা হল আল্লাহ যে সময়ে যতটুকু প্রয়োজন সে সময়ের জন্য ততটুকু কুরআনের ইলেম প্রকাশ করেছেন।

এজন্য প্রতি যুগে কুরআন মানবজাতির জন্য যুগোপযোগী ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়। যারা কুরআনের আলোয় পথ দেখতে চায় আল্লাহ তাদের জন্য সেই পথ করে দেন।

সূরা কাহাফ শেষ যুগের সূরা। কাজেই এটা স্বাভাবিক যে এর ইলেম আল্লাহতায়ালা শেষ যুগের কুরআন গবেষকদের কাছে বিশেষভাবে প্রকাশ করবেন। যারা কুরআনের এই আবেদনকে অস্বীকার করে তারা স্বাভাবিকভাবেই পূর্বের অপূর্ণ ইলেম নিয়েই পড়ে থাকবেন।

এই বিষয়টিকে আল্লাহ সূরা কাহাফের একেবারে শেষাংশে উল্লেখ করেছেন যাতে শেষ যুগের বিশ্বাসীরা কুরআনের সূরা কাহাফের বিস্ময়কর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে হতচকিত না হয়ে যায়।

“বলুন, আমার প্রতিপালকের কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, এ কাজে সাহায্যের জন্য আরো সমুদ্র যোগ করলেও।” (সূরা কাহাফের ১০৯ নং আয়াতের অনুবাদ)

Say, “If the sea were ink for writing the words of my Lord, the sea would be exhausted before the words of my Lord were exhausted, even if We brought the like of it as a supplement.” (Sura Kahf, 109)

যারা তারপরও মেনে নিতে পারছেন না, তাদের নিকট প্রশ্ন, পৃথিবীতে কুরআনের যত তাফসীর প্রকাশিত হয়েছে তার জন্য কয়টি সমুদ্র সমান কালি ব্যবহৃত হয়েছে?

র‍্যাবাইদের সেই তিনটি প্রশ্ন

মক্কার কুরাইশদের কাছে দীর্ঘদিন নবী না আসায় তারা নবীদের সম্পর্কে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম নবী দাবি করার পর তারা এ দাবির সত্যতাকে যাচাই করার জন্য মদীনার ইহুদীদের শরণাপন্ন হল। কারণ তাদের কাছে নিয়মিত নবী আসছিল এবং তারা একজন নবীর প্রতীক্ষায় ছিল।

তারা ইয়াসরিবে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাল।

ইহুদী র‍্যাবাইরা প্রতিনিধি দলের নিকট তিনটি প্রশ্ন বলে দিল যা একজন নবীর পক্ষেই উত্তর দেয়া সম্ভব।

প্রথম প্রশ্নটি ছিল, তাকে জিজ্ঞেস কর সেই যুবকদের কি হল যারা প্রাচীনকালে গায়েব হয়ে গিয়েছিল, এবং তাদের সম্পর্কে একটি সুন্দর কাহিনী রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল, তাকে সেই পরাক্রমশালী পর্যটকের কথা জিজ্ঞেস করো যে, পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের কাছাকাছি পৌছেছিল।

তৃতীয়তঃ তাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম কি উত্তর দেন ইহুদী র‍্যাবাইরা সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই আগ্রহী ছিল। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য তারা মনে করত ইহুদীদের বাইরে আর কোন নবী আসবে না। আর তারা তৌরাতকে পরিবর্তন করে ইসমাঈল য়ালাইহিস সালামকে হেয় করত বা বন্য গর্দভ আখ্যা দিত।

আল্লাহ পাক কুরআনে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। রূহ সম্পর্কিত উত্তরটি দিয়েছেন সূরা বনী ইসরাঈলে। বাকী দুটি উত্তর সূরা কাহাফে।

রূহ বিষয়ক প্রশ্নটি ছিল হেঁয়ালি ও চালাকিপূর্ণ। মানুষের আত্মাকে রূহ বলা হয়, হযরত জিবরাঈল য়ালাইহিস সালামকে রূহ বলা হয় আবার আল্লাহ যখন বলেন বলেন, তিনি মানুষের মধ্যে তাঁর রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন, তখন বুঝা যায় আল্লাহই প্রকৃত রূহের অধিকারী।

উপরের সবকটি সম্ভাবনাকে আল্লাহ সংক্ষিপ্তভাবে এক উত্তরের মধ্যে নিয়ে আসেন।

“আর তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি বলুন, রূহ আমার প্রভুর আদেশ। আর এ বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭ঃ৮৫)

বলা যায়, আল্লাহ এক কথায় তাদের প্রশ্নটিই খারিজ করে দিলেন, যে এ বিষয়ে তোমাদের জ্ঞান সামান্য, এটা তোমাদের বোঝার বিষয় না।

দ্বিতীয় প্রশ্নের আড়ালে তাদের গোপন প্রশ্ন ছিল। সেটা ছিল ইয়াজুজ মাজুজ সম্পর্কিত, যার ব্যাপারে শুধুমাত্র নবীরাই জানতে পারেন। দ্বিতীয় উত্তরটি যুলকারনাইন এবং ইয়াজুজ মাজুজের সঠিক ঘটনাটি ব্যাখ্যা করেছে।

প্রথম প্রশ্নটি ছিল গুহার যুবকদের সম্পর্কে। এর আড়ালের প্রশ্নটি ছিল দাজ্জাল সম্পর্কে। কিন্তু আল্লাহ কুরআনের কোথাও দাজ্জালের নাম উল্লেখ না করেই যুবকদের বিস্তারিত তথ্য দেন। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সালাম প্রকাশ করে দিলেন, যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত তিলাওত করবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। এই প্রথম দশ আয়াতেই গুহার যুবকদের কাহিনীর সূচনা হয়েছে। তাই দাজ্জাল বিষয়ে র‍্যাবাইগণ অনুমানের জালে আবদ্ধ রইল।

এই তিনটি প্রশ্নের যে উত্তর নবীজী সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছেন, আজ চৌদ্দশ বছর হয়ে গেল ইহুদীরা উত্তর তিনটি সম্পর্কে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

শায়খ ইমরান নযর হোসেন তার সূরা কাহাফ এবং বর্তমান বিশ্ব গ্রন্থে সারা বিশ্বের ইহুদীদের আহবান জানিয়েছেন তারা যেন উত্তর তিনটি নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

শেষ জমানার আলেম ও মুসলিম নেতৃবৃন্দের কিরূপ হওয়া উচিৎ আরা তারা কি হচ্ছে?

wall

প্রাচীর ও গ্রামবাসীর ঘটনার ব্যাখ্যা –

প্রথমে নৌকায় ফুটো, দ্বিতীবার বালক হত্যা করার পর তারা আবার পথ চলতে লাগলেন।

একটা গ্রামের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা গ্রামবাসীর কাছে খাবার চাইলেন। ইতিমধ্যে তারা অনেক ক্লান্ত হয়েছেন। কিন্তু গ্রামবাসী তাদের মেহমান হিসেবে নিতে অস্বীকার করল। সেখানে তারা একটা দেয়াল দেখলেন যা কাত হয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। খিযির দেয়ালটিকে ছোঁয়া মাত্রই সেটি সোজা হয়ে গেল।

মূসা য়ালাইহিস সালাম বললেন, এই লোকগুলি আমাদের খাবার দিল না, মেহমান হিসেবে নিল না, আর আপনি তাদের দেয়াল মেরামত করে দিলেন? আপনি তাদের কাছে এর পারিশ্রমিক চাইতে পারতেন।

খিযির বললেন, এটাই আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময়। আমি এবার এই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দিবো যেগুলোতে আপনি ধৈর্য ধরে রাখতে পারেননি।

প্রথম ও দ্বিতীয় ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়ার পর প্রাচীর ও গ্রামবাসীর ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেন।

“আর ঐ প্রাচীর যেটা ছিল নগরের দুইজন এতিম বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। তাই তোমার পালনকর্তা দয়াবশত ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ থেকে এটা করিনি। তুমি যে বিষয়ে ধৈর্য ধারণে অক্ষম হয়েছিলে, এই হল তার ব্যাখ্যা।” (সূরা কাহাফ, ৮২)

দেয়ালটির সংস্কারকে মূসা য়ালাইহিস সালাম সেখানকার অধিবাসীদের প্রতি অনুগ্রহ হিসেবে দেখলেন। এমন এক অনুগ্রহ যা তাদের পাওনা ছিল না, কারণ তারা ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত মুসাফিদের প্রতি সদয় হয়নি। সদয় না হলেও কাজের পারিশ্রমিক আদায় করা যেতে পারত। মূসা য়ালাইহিস সালাম সেই পরামর্শই দিয়েছিলেন।

কিন্তু খিজির য়ালাইহিস সালামের উদ্দেশ্য ছিল, দেয়ালটির নীচে রক্ষিত সম্পত্তির সন্ধান যেন গ্রামবাসী না পায়, কারণ তা ছিল দুইজন এতিমের যেন তারা বড় হয়ে তা থেকে উপকৃত হতে পারে।

এই ঘটনাটির মধ্যে সেই সময়ের জন্য এক জরুরী বাণী রয়েছে যখন মু’মিনরা দেখবে ইসলামের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। মুসলমানরা এতিম বালকদের মতো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় শেষ জমানার আলেম ও মুসলিম নেতৃবৃন্দের উচিৎ তারা যেন খিজির য়ালাইহিস সালামের অনুকরণে সেটির মেরামত করে যেন পরবর্তী বংশধরদের হাতে ইসলামের জ্ঞান-সম্পদ সুরক্ষিত অবস্থায় তুলে দিতে পারে।

শায়খ ইমরান নযর হোসেনের মতামত এই যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোট ছোট মুসলিম গ্রাম তৈরী করতে হবে যে গ্রামগুলি হবে সেই দেয়ালের মতো যার নীচে এতিমদের সম্পদগুলোকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হল এই যে, আল্লাহ নিজেই এই রকম গ্রামগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, যেমন তিনি সূরা কাহাফের সেই রূপক দেয়ালটির বেলায় করেছিলেন।

অর্থাৎ কেউ উদ্যোগ নিলেই আল্লাহ এর জন্য সাহায্য করবেন। যেমনভাবে, খিযির দেয়ালটিকে ছোঁয়া মাত্রই সেটি সোজা হয়ে গেল।

কিন্তু আমাদের আলেম উলামারা কি করছেন? তারা দ্বীনের কাজ করে ঐসব লোকদের থেকে পারিশ্রমিক নিচ্ছে যারা ইসলামের প্রতি সদয় হতে ইচ্ছুক নয়। এর কারণ হিসেবে তারা দেখাচ্ছে তাদের জীবিকা কিরূপে নির্বাহ হবে এই যুক্তিকে। কিন্তু আল্লাহ সূরা কাহাফে দেখিয়েছেন, যদিও পর্যটকগণ ক্লান্ত, শ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ছিলেন তারপরও তারা গ্রামবাসীদের থেকে ন্যায্য পারিশ্রমিকটুকুও নেননি। যেহেতু তারা তাদের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিল না। তারা বিনা পারিশ্রমিকে দেয়াল নির্মাণ করেছিলেন।

আর আমাদের আলেম উলামা আমীররা দারিদ্র, কষ্টকে বরদাশত করতে রাজি নন। তারা মসজিদ কমিটির কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিচ্ছেন, সরকার থেকে পারিতোষিক গ্রহণ করছেন, টিভি চ্যানেল থেকে বেতন নিচ্ছেন, সৌদি বাদশাহের বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে স্কলারশিপ নিচ্ছেন, ……। বলতে গেলে লিস্ট আরো বড় হবে। আজকের দিনে আলেম বা আমীর হওয়াও একটা দুনিয়াবী ক্যারিয়ার।

সূরা কাহাফে বর্ণিত ঘটনায় হযরত মূসা য়ালাইহিস সালামের মতো একজন বিচক্ষন নবী পর্যন্ত ভেবেছিলেন পারিশ্রমিক গ্রহণে কোন বাঁধা নেই। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন খিজির য়ালাইহিস সালাম ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত অবস্থায়ও মজুরি গ্রহণ করলেন না। এটাই আজকের দিনে মুসলিম আলেম ও নেতৃবৃন্দের প্রতি গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দিকনির্দেশনা।

আজকের দিনে এমন আলেম উলামা দরকার যারা ইসলামের জ্ঞান বিনা পারিশ্রমিকে পরবর্তী বংশধরদের জন্য রেখে যাবেন যেন তারা যখন শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াবে সে জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে পারে।