কত কঠিন তাদের মুখের কথা

সূরা কাহাফ একটি শেষ যুগের সূরা যাতে শেষ যুগের অদ্ভুত ঘটনাবলীর প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। এ সূরার প্রথম ১০ আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সূরার শেষ ১০ আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং মাঝখানের আয়াতগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ যুগের মানুষেরা কি পরিমাণ মিথ্যাবাদী হবে তার বর্ণনা ৪র্থ আয়াতে পাওয়া যায়। এবং তারা কি পরিমাণ নির্বোধ তা এর পরের আয়াতে। এমনকি তারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে, যে আল্লাহর সন্তান রয়েছে। “এ সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও নেই। কত কঠিন তাদের মুখের কথা। তারা যা বলে তা তো সবই মিথ্যা” (সূরা কাহাফ, ৫)। এই হলো তাদের প্রতি কোরআনের মূল্যায়ন। যারা আল্লাহ সম্পর্কে এতো বড় মিথ্যা কথা বলতে পারে, যারা তাদের সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এতো অজ্ঞ তারা যতই জ্ঞানী লোকের বেশ ধরে থাকুক বাস্তবে তারা অজ্ঞ এবং মিথ্যাবাদী। তারা দুনিয়াবি অন্যান্য ব্যাপারেও স্বাভাবিকভাবে মিথ্যা কথা বলবে।

Advertisements

শেষ যুগে কুকুর পালনের তাৎপর্য

সুরা কাহফের আসহাবে কাহফের কাহিনী অনুযায়ী, কুকুর হচ্ছে পালন করা প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো। লিটারেরি এবং সিম্বলিকালি। কুকুর আপনার ভেড়াগুলোকে দেখাশোনা করবে ও পাহাড়া দেবে। ভেড়া হলো তারুণ্য আর কুকুর হলো পাহাড়াদার। পাহাড়াদার মুসলমান হোক বা অমুসলিম, সে তারুণ্যকে নিজের জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবে। উদাহরণঃ মহানবী (সা) এর চাচা আবু তালিব।

Md Arefin Showrav
14.02,2017

সময় ও সংখ্যার যান্ত্রিক বনাম পবিত্র ধারণা

যখনই আলেমদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মোরগ লাড়াই শুরু হয় তখনই উম্মতের জন্য ধেয়ে আসে আক্রমণ। যখন তাতারীদের আক্রমণ হয়েছে তখনও মুসলিম স্কলাররা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে মত্ত ছিলেন। ঠিক নেবু কাদনেজার যখন জেরুজালেম আক্রমণ করেছিলেন ইহুদী পণ্ডিতরা জানকবুল হাস্যকর বাকযুদ্ধ শুরু করেছিলেন।

এ উম্মত ইহুদীদের অনুসরণ করবে গজে গজে বিঘতে বিঘতে।

৪৯ কোটি নেকীর ফজিলত নিয়ে যে গোলযোগ তারা লাগিয়েছেন তাতে নেকীর বদলে কত ৪৯ কোটি গুনাহ হচ্ছে, কত জন একজন আরেকজনের রায়ে কাফেরের খাতায় নাম লিখিয়েছে তা হিসাব নেয়ার মতো ক্যালকুলেটর তৈরি হয়নি।

সংখ্যা নিয়ে এই সমস্যার মূল কারণ সময় ও সংখ্যা বিষয়ে সীমাহীন অজ্ঞতা। সময়ের যে ধারণা তাদেরকে স্রষ্টা বিমুখ পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা দিয়েছে তা গ্রহণ করা। এবং কুরআনে বর্ণিত সময়ের পবিত্র ধারণা বিষয়ে অনবহিত থাকা। আশ্চর্য নয় যে কেন এ বিষয়গুলো দারুল উলূমের পাঠ্য নয়। অপরদিকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এমন সব বিষয় যা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও শ্রূতিমধুর।

সময়ের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে প্রথাগত আলেমরা এখনও দাজ্জালকে বুঝতে পারেন নি। অদূর ভবিষ্যতে বুঝতে পারার কথাও নয়। কারণ দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদীসে সময় একটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আর এ বিষয়টিই প্রচলিত জ্ঞানশাস্ত্রে অবহেলিত।

।।

যাহোক,

এখন তাবলীগকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তারা কি ৭০০ গুণন ৭ লাখ = ৪৯ কোটির ফজিলত রাখবে? নতুন সাথী ধরা বেশী গুরুত্বপূর্ণ নাকি উম্মাহর আলেম উলামার ভেটো বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কম-সে-কম উম্মাহর ঐক্যের বিষয়টা তো খেয়াল রাখতে হয়।

এ ভাবে গুণ অংক কষে হাদীসের ব্যাখ্যা দেয়ার ইসলামী ঐতিহ্য আছে কি? সাহাবা রাযি থেকে কোন কিছু বর্ণিত আছে কি? এটা তো পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের অংকের ক্লাশরূম নয়। এটা দ্বীন। অবিকল ও অবিকৃত।

এ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জবানীতে বর্ণিত কাবা’র সম্মানকে বাড়ানো হল, নাকি কমানো হল? রাসূল সা বলেছেন মসজিদুল হারাম / কাবায় সালাত আদায় করলে ১ লক্ষ গুন সওয়াব। এখন আপনার এতোই দরকার হল এর সাথে ৪৯ কোটি গুন করার? রাসূল সা এর ফায়সালা আপনাদের সন্তুষ্ট করতে পারল না? আবার নতুন ব্যাখ্যার নতুন ফায়সালা দরকার?

সাহাবা রাযি তো রাসূল সা এর মুখের উপর কোন কথা বলেন নাই। এ কোন ইহুদী নাসারা বাদীর লক্ষণ?

।।

যারা কুরআন হাদীসকে ক্যালকুলেটরে হিসাবের বিষয়বস্তু করে তারা যে এর অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক।

ইসলাম ধর্মটা এমন, যদি কোন ব্যক্তি গুণ অংক না জানে বা ক্যালকুলেটর চালাতে না পারে সে-ও পরিপূর্ণভাবে দ্বীন পালন করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ্‌। কুরআন ও হাদীস আমাদের জন্যই এতোই সহজ করা হয়েছে। এজন্য কোন যন্ত্রপাতি বা কিন্ডার গারটেন স্কুলে শিক্ষার প্রয়োজন নেই। আলহামদুলিল্লাহ।

………

সময় সম্পর্কিত ইমরান নযর হোসেনের ব্যাখ্যা জানতে পড়ুনঃ 

সূরা কাহাফ ও বর্তমান বিশ্ব

মিথ্যাচার

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াতের মধ্যে আল্লাহতায়ালা দাজ্জালী বাহিনী তথা ইহুদী খ্রিস্টান জোটের মিথ্যাচারকে উল্লেখ করেছেন। তারা বড় বড় মিথ্যার জালে মানুষকে আটকে ফেলে। যেমন তারা বলে, আল্লাহর একটি পুত্র সন্তান আছে। এখানে ইঙ্গিত রয়েছে এভাবে দাজ্জাল মানবতাকে বড় বড় মিথ্যার ফাঁদে ফেলবে।

যেমন তার সহকর্মীরা শুনাবে যে, ইরাকের কাছে গণ-বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে। ইরান একটি পারমাণবিক হুমকি। আরব ও মুসলিমরা ৯/১১ আক্রমণের জন্য দায়ী। মাদ্রাসা মসজিদে জঙ্গী তৈরী হয়। নারী জাগরণের মাধ্যমে নারীদের প্রকৃত উন্নতি হয়। সুদ ছাড়া অর্থনীতি অচল। গণতন্ত্রের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মুক্তি।

ফলে সত্যকে ধ্বংস করার পথ তৈরী হয়। উদাহরণস্বরূপ, নারী জাগরণের কথা বলে নারীদের পর্দার অধিকারকে বাধাগ্রস্থ করা হয়।

এবং মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করা হয়।

এখানে একটি অতিরিক্ত বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। ইরাকে আক্রমণের পর তারা দু’টি জিনিস পায়নি। এক, মারণাস্ত্র; দুই, সাদ্দামের দুর্নীতি। যদি এ’ দুটির একটিকেও তারা পেত তাহলে ইরাক আক্রমণকে জায়েয করে ফেলত। যদিও প্রথমদিকে তারা সাদ্দামের সোনার টয়লেট এবং বিলাসবহুল জীবনের প্রচারণা ছড়িয়েছে। বাইতুল্লাহর মুসাফির গ্রন্থে লেখক সাদ্দামের বাসভবনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেছেন এবং তার সাধাসিধা জীবনযাপনকে তুলে ধরেছেন, যদিও রাষ্ট্র পরিচালনায় সাদ্দাম দ্বীনী আদর্শ বাদ দিয়ে পাশ্চাত্য সেক্যুলার নীতিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

সূরা কাহাফ এবং ব্রেক্সিট

Surah Kahf and Brexit

Read Surah Kahf to understand the present scenario

সূরা কাহাফ আমাদের কাছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি ঘৃণ্য যুদ্ধের কাহিনীর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে যার ফলশ্রুতিতে সাতজন যুবক নিজেদের ঈমান রক্ষার্থে ঐ ক্ষয়িষ্ণু সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আল্লাহতায়ালা তাদের ঘুমন্ত সময়গুলোতেও মানুষের অন্তর তাদের প্রতি আতঙ্কগ্রস্থ করে রাখেন।

আজ আমরা দেখছি বৃটিশ আমেরিকা জোট ইসলামের বিরুদ্ধে সেই একই ঘৃণ্য যুদ্ধের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে খেলাফতকে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং ইহুদীদের জন্য পবিত্রভূমির অবৈধ দখলকে বৈধতা দান করেছে। যার ফলে চলমান প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা থেকে মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সমাজব্যবস্থায় মুসলমানদের এ শূন্যতাকে ঢাকার জন্য / প্রক্সি দেয়ার জন্য অনেকগুলো যায়োনিস্ট মুসলিম রাষ্ট্র তৈরী করা হয় যাদেরকে ‘মুসলিম বিশ্ব’ নাম দেয়া হয়। প্রকৃত মুসলমানরা সমাজের মূলধারা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার পরও আশ্চর্যজনকভাবে আল্লাহতায়ালা মানুষের অন্তর তাদের প্রতি আতঙ্কগ্রস্থ করে রাখেন।

সূরা কাহাফের ঐ সাত যুবক যখন দীর্ঘ ঘুম থেকে জাগ্রত হন ততদিনে ইসলামের প্রতি তৎকালীন যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং ঐ অঞ্চল মুসলমানদের জন্য নিরাপদ হয়েছে। এমনকি ঐ অঞ্চলের মানুষেরা তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

আজকে ব্রেক্সিটের মাধ্যমে একটি সন্ত্রাসী সমাজের বিচ্ছিন্নতা মুসলমানদের দীর্ঘ ঘুমের শেষ দিকের সময়গুলোকে ইঙ্গিত করছে। মুসলমানরা যখন জেগে উঠবে ততদিনে ঐ সন্ত্রাসী সমাজ যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর যুদ্ধ করেছিল তারা ধ্বংসাবশেষে পরিণত হবে। তাদের আজকের মুদ্রাগুলোও অকেজো হয়ে যাবে। (তাদের রাজা রানী বাদশাহদের ছবি অঙ্কিত) ডলার পাউন্ড স্টারলিং ইউরো রিয়াল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। যেমনভাবে সূরা কাহাফের ঐ সাত যুবক ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর তাদের কাছে সংরক্ষিত তৎকালীন ফটকা মুদ্রাগুলো ততদিনে অচল হয়ে গিয়েছিল (এবং প্রকৃত মুদ্রাব্যবস্থার যুগ ফিরে এসেছিল)।

জগতসমূহের বিবর্তনের প্রকৃত ধারণা (এবং সত্যস্বপ্ন)

Baitul Maqdis

আল্লাহর সৃষ্টিজগতের সবকিছু বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টির অন্য সবকিছুর মত সময়েরও বিবর্তন হয়েছে, এবং তার মধ্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

১…কুন

সৃষ্টির শুরু হয়েছিল একটি ‘কুন’ বা ‘হয়ে যা’ শব্দ দিয়ে, অতএব বিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন সৃষ্টি বিভিন্ন পর্যায় ও বিভিন্ন জগতে আবির্ভূত হয়। সৃষ্টিগজতের সবকিছুর সাথে সময়েরও বিবর্তন হয়, এবং তার মধ্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়। এভাবে আল্লাহ স্থান ও সময়ের সাতটি ভিন্ন ভিন্ন জগত সৃষ্টি করেন। অন্য সমস্ত সৃষ্টবস্তু যার যার পরিচিত স্থান ও সময়ে স্থিত হয়।

সৃষ্টজগতের বিবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হয় এক কুদরতী আদেশ তথা ‘কুন’ শব্দের মাধ্যমে। বিজ্ঞানে এর হাইপোথেটিকাল নেম বিগ ব্যাং।

“তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন তখন সেটিকে এ কথাই বলেন, ‘হয়ে যাও!’ তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়।” (সূরা বাকারা, ১১৭)

২…বিবর্তন দুই জিনিসের – স্থান ও সময়ের

হাদীস থেকে জানা যায় ‘প্রথম সৃষ্ট আলোর’ কথা যাকে সকল সৃষ্টির উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জাবির রাযিআল্লাহু তায়ালা য়ানহু থেকে বর্ণিত, “আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে জানিয়ে দিন আল্লাহ কোন জিনিসটি অন্য সবকিছুর আগে সৃষ্টি করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, মহান আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সৃষ্টি করার আগে নিজের নূর থেকে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন।” এটিই সৃষ্টির প্রথম পর্যায়।

সৃষ্টির প্রথম পর্যায়কে বলা যায় সূক্ষ্ম অস্তিত্বের পর্যায়, অর্থাৎ যা বস্তুর মত স্থূল নয়, বরং যা স্থানহীন ও সময়হীন। সৃষ্টির সেই সূক্ষ্ম অস্তিত্বের পর্যায়ে আল্লাহপাক মানুষ ও নবীদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। (দ্রঃ সূরা আ’রাফ, ৭ঃ১৭২) ও (দ্রঃ সূরা আল ইমরান, ৩ঃ৮১)

অতঃপর স্থান ও সময়ের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় কোন এক আলোর জগতে ফেরেশতা সৃষ্টি হয়। এভাবে আগুনের জগতে জ্বীন জাতির সৃষ্টি হয় এবং মাটি, পানি ও আলো-হাওয়ার জগতে মানব, প্রানী ও উদ্ভিদকূলের সৃষ্টি হয়।

বিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় পূর্ববর্তী সৃষ্টির তুলনায় পরবর্তী সৃষ্টি সূক্ষ্মতা, পরিমার্জন, অস্পৃশ্যতা এবং গুণসম্পন্নতার দিক দিয়ে ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। পক্ষান্তরে প্রগতির ধারায় পরবর্তী সৃষ্টির স্থূলতা, অনুভবযোগ্যতা, ভিন্নতা এবং পরিমাপযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এটাই হচ্ছে সৃষ্টজগতের মধ্যে এক জিনিস থেকে আর এক জিনিসের উৎপত্তি, বা ‘হয়ে যাওয়া।’ এই প্রক্রিয়া সদা সর্বদাই বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর সৃষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

কিন্তু তা কখনোই র‍্যান্ডমলি বা স্বাধীনভাবে হয় না। কারণ সৃষ্টিজগত শুধু আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নাম আল-খালিক্বের মুখাপেক্ষী নয়, বরং আল্লাহ তায়ালার আর দু’টি গুণবাচক নাম আর-রব্ব ও আর-রাজ্জাকের মুখাপেক্ষী। আর-রব্বের অর্থ পালক, রক্ষক, পরিবর্ধক ইত্যাদি। আর-রাজ্জাক অর্থ রিযিকদাতা।

কোন জাতি ও বস্তুকে আল্লাহ কি পরিমাণ বিকশিত করবেন এবং তাকে কিভাবে সৃষ্টিজগতে প্রতিপালন করবেন তার মাত্রা নির্দিষ্ট করা আছে।

“আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা (পরিমাপ) ।” (সূরা তালাক্ব, ৬৫ঃ৩)

এর মধ্যে রয়েছে সময়েরও বিবর্তন ও মাত্রা যার বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন সৃষ্টি পূর্ণতা পেয়েছে। কুরআন সাতটি ভিন্ন আকাশের অস্তিস্ত্বের কথা বলেছে যা একে অন্যের পাশাপাশি অবস্থান করে, এবং এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে সময়েরও সাতটি মাত্রা রয়েছে, যার ভেতর দিয়ে দুই দিকেই গমনাগমন করা যায়, এবং এর প্রত্যেকটিই পৃথিবীর জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

“তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফেরাও, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” (সূরা মূলক, ৬৭ঃ৩)

সময় ও স্থানের বিভিন্ন মাত্রার ভেতর দিয়ে মানুষের বিবর্তন ঘটেছে। পরিশেষে সে এই পৃথিবীতে এসে হাজির হয়েছে। ইতিমধ্যে সময় ও স্থানের কোন এক মাত্রায় তাকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে আল্লাহর একত্ববাদের অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হয়েছিল। (দ্রঃ সূরা আ’রাফ, ৭ঃ১৭২)। আবার অচিরেই মানুষ মৃত্যূ, কবর, হাশর, পুলসিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদির মাধ্যমে সময় ও স্থানের অন্য মাত্রায় আরোহণ করবে।

“আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লাল আভার; এবং রাত্রির, আর তাতে যা কিছুর সমাবেশ ঘটে তার, যখন তা’ পূর্ণরূপ লাভ করে। নিশ্চয়ই তোমরা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে আরোহণ করবে।” (সূরা ইনশিক্বাক্ব, ৮৪ঃ১৬-১৯)।

৩…সত্যস্বপ্ন

সত্যস্বপ্ন বা ধর্মীয় ভাববাণী (Prophecy) স্থান ও সময়ের বিভিন্ন মাত্রার বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে। সত্যস্বপ্নের দৃশ্যগুলি এমন ঘটনা যা বিবর্তনের মাধ্যমে এখনো বিভিন্ন জগত পার হচ্ছে। সত্যস্বপ্ন অদৃশ্য জগতের বাস্তবতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সরবরাহ করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সালাম বলেছেন, সত্যস্বপ্ন (এবং সেই সাথে আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি) নবুয়ত শেষ হবার পরেও থাকবে।

“যখন কেয়ামতের সময় নিকটবর্তী হবে, তখন মু’মিনদের স্বপ্ন খুব কমই ব্যর্থ হবে; বিশ্বাসীদের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।”

স্বপ্ন সত্যে পরিণত হবার কারণ এই যে, ঘটে যাবার আগেই সেগুলো অস্তিমান ছিল। আমরা আগেই জেনেছি, কোন ঘটনার সৃষ্টি প্রক্রিয়া শুরু হয় আল্লাহর কুদরতি আদেশ ‘কুন’ থেকে। তারপর সেটা সময় ও স্থানের বিভিন স্তর পেরিয়ে বস্তুজগতে প্রকাশ পায় বা সংঘঠিত হয়। পৃথিবীতে ঘটে যাবার আগেই যখন সেটি আধ্যাত্মিক গোচরে আসে, তাকে সত্য স্বপ্ন বলা হয়।

কুরআনে স্বপ্নের কথা আছে, কিন্তু আমাদের সেক্যুলার শিক্ষা স্বপ্নকে অস্বীকার করে। আজকালকার অনেক হুজুর সেকুলার হয়ে গেছে। তারা এখন আর স্বপ্ন টপ্ন বিশ্বাস করে না, এর ব্যাখ্যাও দেয় না।

৪…সাত আকাশ

সময় ও স্থানের বিভিন্ন মাত্রাকে আকাশ বা সামাওয়াত বলা হয়। এটি পরিষ্কার যে, আমরা সেই মিলনস্থল নির্ধারণ করতে পারি না, যেখানে প্রথম আকাশ বা স্তর শেষ হয়েছে আর দ্বিতীয় আকাশ বা স্তর শুরু হয়েছে। কারণ আকাশগুলি এমন নয় যে তা লম্বভাবে একে অপরের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বরং প্রতিটি আকাশ নিজস্ব মাত্রা বজায় রেখে একটি অপরটির সাথে মিশে রয়েছে। এজন্যই মানুষ যখন সিজদায় যায় তার আর আল্লাহর মাঝে আর কোন দূরত্বগত বাঁধা থাকে না। অথবা মানুষ যখন শহীদ হয় মৃত্যুর পূর্বেই তার কাছে জান্নাতের জগত এনে হাজির করা হয়। সে দুনিয়ায় থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পায়।

কিভাবে আলাহ তায়ালা সাতটি আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন এ ব্যাখ্যার মধ্যে নিহিত আছে আল্লাহ যে সর্বত্র বিরাজমান এ বিতর্কের অবসান। আল্লাহপাক তার আরশে সমাসীন কিন্তু সেই আরশ হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে নয়। বরং আমাদের ঘাড়ের শাহ ধমনীর থেকেও নিকটে। কিন্তু তাঁর ও আমাদের মধ্যে আছে সাতটি আকাশের আপাত অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব।

ঠিক যেমন আমল নামা লেখার সম্মানিত ফেরশতা কিরামান কাতিবীন আমাদের দু’ঘাড়ে অবস্থান করেও কিন্তু আমাদের আকাশ বা সামা’তে নয় বরং স্থান ও সময়ের অন্য মাত্রায় অবস্থানরত।

অতএব এক আকাশ থেকে আরেক আকাশে প্রবেশ করার জন্য মহাকাশ যানের সাহায্যে হাজার হাজার আলোকবর্ষ ভ্রমণ করার প্রয়োজন নেই। যে কোন মুহূর্তে এক মাত্রা থেকে বেরিয়ে অন্য মাত্রায় প্রবেশ করা যায়। একাজ করার জন্য কোন কর্মচাঞ্চল্যের প্রয়োজন নেই, অর্থাৎ সময় ও স্থানের ভেতর নড়াচড়ারও প্রয়োজন নেই।

এখানেই পাওয়া যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু য়ালাইহিস সালামের ইসরা ও মি’রাজের অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা, যখন তিনি মক্কা হতে জেরুজালেম পর্যন্ত এবং তারপরে সপ্তাকাশের ভিন্ন ভিন্ন সময় ও স্থানের মাত্রার ভেতর দিয়ে আরোহণ করে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে ঈসা য়ালাইহিস সালামের আসমানে আরোহণ, এবং দাজ্জালের এক দিন সমান এক বৎসর, এক দিন সমান এক মাস ও এক দিন সমান এক সপ্তাহ ভিন্ন স্থান ও সময়ের মাত্রায় কাটিয়ে আমাদের পরিচিত স্থান ও সময়ের মাত্রায় এক দিন সমান এক দিনে ফিরে আসা।

হতে পারে দাজ্জালের এক বৎসর পৃথিবীর প্রায় সাতশ বছরের সমান যা প্যাক্স ব্রিটেনিকা নামে পরিচিত। আবার তার এক মাস পৃথিবীর প্রায় ৭০-৮০ বৎসরের সমান যা প্যাক্স আমেরিকানা নামে পরিচিত। আমরা অপেক্ষায় আছি দশ বিশ বছরের প্যাক্স জুদাইকার যা হবে পৃথিবীর ভয়ঙ্কর যুদ্ধের ফিতনার দিন।

ইসলাম স্থান ও সময়ের বিবর্তনকে ঠিক ঠিক ব্যাখ্যা করে যার মধ্যে নিহিত আছে হেকমত বা প্রকৃত বিজ্ঞান। এটা বুঝার জন্য প্রয়োজন ঈমান। ডারউইনবাদ বা নাসার মহাকাশ বিজ্ঞান অথবা ইউরোপ আমেরিকার সেক্যুলার সায়েন্টিফিক জ্ঞান দ্বারা তার কিছুই বুঝা যাবে না।

আল্লাহু য়ালাম।

(শায়খ ইমরান নযর হোসেনের ‘সূরা কাহাফ এবং বর্তমান বিশ্ব’ এবং ‘পবিত্র কুরআনে জেরুজালেম’ গ্রন্থ অবলম্বনে)

জীবনের ভুল বসন্ত

সূরা কাহাফ শেষ যুগ বিষয়ক সূরা। এ সূরায় শেষ যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ সূরার আলোকে নিজের জীবন ও চারপাশের পরিবেশ দেখে নেয়ার সুযোগ আছে। আমার ফেলে আসা পেছনের দিনগুলো কেমন ছিল?

আমি যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাসায় আমার নানার ব্যবহৃত কিছু দ্রব্যসামগ্রী তখনও ছিল যিনি গত হয়েছিলেন স্বাধীনতার কয়েক দশক পূর্বে। একটি পেতলের কলসে আমার নানার নাম লেখা ছিল। আর ছিল একটি পেতলের ময়ূরের পানদানি। বুঝা যায় ভদ্রলোক সৌখিন ছিলেন। এ লেখাটি লেখতে গিয়ে সেই কলস ও পানদানির কথা মনে পড়ল। সেগুলো এখন কোথায় আছে আমার জানা নেই। আমাদের বাসায়ই তো ছিল। এরপর অনেকবার বাসা বদল, লেখাপড়ার জন্য হোস্টেলে থাকা, নিজের সংসার হওয়া, সেখানে নতুন বংশধর আসা – এতো এতো ঘটনায় সে কলস ও পানদানি যে কোন ধুলোর মধ্যে মিশে গেছে কেউ খবর রাখেনি।

ইতিমধ্যে আমার বাবাও গত হয়েছেন কয়েক বছর হল। তারও একটি সংসার ছিল, বন্ধুবান্ধব ছিল, ব্যবসা ছিল, মেট্রিকের সার্টিফিকেট ছিল। আমরা একসাথে খেতে বসতাম, একসাথে জীবন যাপন করতাম। কিন্তু কিছু মাটির দলাকে বুনো বাতাস যেমন তার অংশগুলোকে ভেঙ্গে গুড়ো করে দূরে উড়িয়ে নিয়ে যায়, আমার বাবার সংসারের সবকিছুই তেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। দিন যায়, মাস যায় তবুও জীবনের বাস্তবতায় আমাদের ভাইবোনদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগও হয় না।

একদিন আমারও শৈশব ছিল, শৈশবের মধুর দিন ছিল, মামার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ছিল, এসএসসি পরীক্ষা ছিল, নতুন বইয়ের গন্ধের ভালো লাগা ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। জীবনের প্রতিটি দিন এসেছে সবুজ হয়ে আর ঝরে গেছে ধুলো হয়ে। সেই সবুজ আসলে ছিল ফলস সবুজ আর ধুলোটাই হয়েছে সত্যি।

সূরা কাহাফ এই বাস্তবতাকে তুলে ধরার মাধ্যমে শেষ যুগের অনুসন্ধানী মানুষদের চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ করে দিয়েছে। যাতে তারা দাজ্জালের রঙ্গীন পৃথিবীর মোহে ঈমান ও আমলের মূল্যবান সঞ্চয়ের সময়টাকে নষ্ট হতে না দেয়।

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াতের মধ্যে আমাদের এই বিষয়ে বুনিয়াদী শিক্ষা দেয়া হয় যা দাজ্জালের বস্তুগত আক্রমণের বিপরীতে আধ্যত্মিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

“আমি পৃথিবীস্থ সব কিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে। এবং এর উপর যা কিছু রয়েছে তা অবশ্যই আমি উদ্ভিদশূন্য মাটিতে পরিণত করব।” (সূরা কাহাফ, ৭-৮)

এভাবে সূরা কাহাফ পৃথিবীর ক্ষণস্থায়িত্ব ও তার অসারতার কথা বর্ণনা করে। দাজ্জাল মানুষের কাছে পৃথিবীকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে, কিন্তু দিনশেষে তা ধুলার পাত্রে পরিণত হয়।

এটা সেই পরীক্ষার খাতার মতো যা অনেক সুন্দর ও চকচকে থাকে কিন্তু পরীক্ষার পর তা ময়লার স্তূপে পরিণত হয়। আসল লাভবান সে-ই যে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় মার্ক সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া ওই খাতাটির আর কোন মূল্য নেই সেটা যতই দামি ও সুন্দর হোক না কেন।

“তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। এটা পানির ন্যায় যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি। অতঃপর এর সংমিশ্রণে শ্যামল সবুজ ভূমিজ লতাপাতা নির্গত হয়; অতঃপর তা শুকিয়ে এমনভাবে গুঁড়ো হয়ে যায় যে, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ এসব কিছুর উপর শক্তিমান। ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা, তবে তোমার প্রতিপালকের নিকট সৎকর্মের ফল হবে স্থায়ী, এবং এই আশ্বাসের মধ্যেই রয়েছে প্রতিদানের সকল আশা।” (সূরা কাহাফ, ৪৫-৪৬)

পৃথিবীর মায়াময় মাটিতেই যে জিনিস মূল্য হারিয়ে অচিরেই মাটির দলার মতো হয়ে যায়, আখিরাতের সেই সঙ্কুল দিনে এর কি মূল্য থাকতে পারে !

Spring-is-Here

The False Spring of Life