ওদের বুদ্ধি

ইহুদীদের জ্ঞান বিজ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে প্রশংসাসূচক পোস্ট একের পর এক আসছেই। এগুলো ইসরাঈলি এজেন্টরা ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশে তারা এখন খুব সক্রিয়। তাদের ফেসবুক পেজও খুব একটিভ। এসব পোস্টে সাধারণ মুসলমান বিভ্রান্ত হতে পারে। এগুলো ইহুদীদের পুরনো মাইন্ড গেম। পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে এগুলো থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা প্রকৃতপক্ষে কুরআন হাদীসের নূর দিয়ে পৃথিবীকে বিচার বিশ্লেষণ করে তাদের কাছে ইহুদীদের জ্ঞান গরিমার কানা কড়ি মূল্য থাকার কথা নয়। মুসলমানরা কুরআনের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লামের কৌশলগত সুন্নাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। আল্লাহ্‌ তায়ালা আমাদের দৃঢ়পদ রাখুন। জালিমদের মাইন্ডগেমের কাছে হেরে যাওয়া থেকে হেফাজত করুন।

Advertisements

আল্লাহ্‌র কিতাবকে বদলে দেয়ার পরিণাম

মদিনার ইহুদিরা অ-ইহুদিদের বলে বেড়াত যে, “মদিনায় একজন নবী আসবেন। যখন সেই প্রতিশ্রুত একজন আসবেন, তখন তোমাদের দেখে নেব।” কিন্তু যখন রাসুলুল্লাহ (সা) সত্য সত্যই মদিনায় এলেন, তখন ইহুদিরা তাঁর ঘোর বিরোধী হয়ে উঠল। কারণ ইহুদিদের পূর্বপুরুষরা তওরাতের বাক্য পরিবর্তন করে নবী ঈসমাঈল (আ) সম্পর্কে এত খারাপ কথা লিখেছিল যে, কোন আরবকে রাসুল হিসেবে মেনে নেয়া ইহুদিদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তারা আল্লাহর বাণীকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিবর্তন করত। তারা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল করত। যেমনঃ সুদ। আল্লাহ সুদকে হারাম করেছিলেন কিন্তু ইহুদিরা কিতাবের বাক্য বদলে দিয়ে লিখল যে, ইহুদিরা ইহুদিদের সাথে সুদের ব্যবসা করবে না, কিন্তু অ-ইহুদিদের সাথে সুদের ব্যবসা করতে পারে। ইহুদিরা মদকে নিজেদের জন্য হালাল করে নেয় এবং তওরাতে বাক্য পরিবর্তন করে লিখে দেয় যে, নবী নুহ (আ) মদ খেয়েছেন। এভাবে তারা আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তাকে নিজেদের জন্য হালাল করে নেয়। কোন কোন ইহুদি তওরাতে উল্লেখিত রাসুলুল্লাহ (সা) এর ভবিষ্যতবাণী মদিনার মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করত, কিন্তু তারপর যখন ইহুদিরা নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করত, তখন এই জাতীয় ভবিষ্যতবাণীর কথা মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করত। তারা ভেবেছিল, এসব কথা প্রকাশ করে দিলে মুসলিমরা আখিরাতের দিনে তাদের সম্মুখ-তর্কে পরাজিত করবে। আল্লাহ তাদের প্রশ্ন করেছেন যে, তারা কী জানেনা যে গুপ্ত ও প্রকাশিত উভয় কথাই আল্লাহ জানেন?

বনী ইজরায়েলের মধ্যে দুধরনের লোক ছিল। একদল হলো আলেম যারা কিতাবের জ্ঞান রাখত। আরেকদল হলো অশিক্ষিত যারা কিতাবের জ্ঞান রাখত না। আলেমগণ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তওরাতে পরিবর্তন করত, নিজের হাতে লেখা পুস্তককে আল্লাহর বাণী বলে চালিয়ে দিত। এভাবে তারা অনেক হারাম কাজকে হালাল বলে ফতোয়া দিত এবং এ সকল কাজ থেকে ফায়দা লুটত ও অর্থ উপার্জন করত।

অশিক্ষিত লোকেরা অর্থাৎ যাদের কিতাবের জ্ঞান ছিল না, তারা অন্ধভাবে এসব ইহুদি আলেম-ওলামাদের অনুসরণ করত এবং এগুলোকে আল্লাহর আদেশ ভেবে পালন করত। তাদের কিতাব পড়ে দেখার ও যাচাই করার কোন ইচ্ছে ছিল না। হুজুর বলেছে, ব্যস এটাই সত্য ভেবে নিজেদের প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত।

বর্তমান জামানায় মুসলিমদেরও একই হাল। আখেরী জামানার আলেমরা ওয়াশিংটন-লন্ডন-প্যারিসের স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছে। কাগুজে মুদ্রাকে হালাল বলে ফতোয়া দিয়েছে, ইলেকট্রনিক মুদ্রাকে হালাল বলে ফতোয়া দিয়েছে। পশ্চিমা গণতন্ত্রকে হালাল বলে ফতোয়া দিয়ে অসংখ্য ইসলামী রাজনৈতিক দল খুলছে। স্পষ্ট সুদকে লাভ বলে ফতোয়া দিয়ে ইসলামী ব্যাংক খুলছে।

আর আল-কোরানের ব্যপারে অশিক্ষিত মুসলিমরা এসব আলেম-ওলামাদের দেয়া ফতোয়াকে শরীয়তসম্মত ভেবে অনুসরণ করছে। একবারও পবিত্র কোরান খুলে, সহীহ হাদিসগ্রন্থ খুলে পড়ে দেখছে না যে, ইসলামে অর্থের সংজ্ঞা কী, রিবার সংজ্ঞা কী, ইসলামী শাসনতন্ত্রের সংজ্ঞা কী! বরং হুজুরের কথা আপাদমস্তক মেনে নিয়ে তারা তাদের বস্তুগত জীবন নিয়ে পড়ে আছে।
ইহুদিরা যেভাবে ভাবে যে, তারা মাত্র কয়েকদিন জাহান্নামে থাকবে আর তারপর জান্নাতে চলে যাবে; মুসলিমরাও এটা ভাবতে শুরু করেছে যে, কালেমা পড়লেই জান্নাত। যদি আপনি আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল করেন, তাহলে সেটা হয় শিরক। আর যারা আল্লাহর কথা না মেনে হারামকে হালাল করা আলেমদের অনুসরণ করবে, তারাও শিরক করবে। আপনাকে বলতে হবে যে, কাগুজে মুদ্রা হারাম, পশ্চিমা গণতন্ত্র হারাম, রিবা হারাম। কিন্তু আজকাল অধিকাংশ মুসলিম পবিত্র কোরানের জ্ঞান না থাকায় এসব শিরকে লিপ্ত হচ্ছে। এভাবে তারা পাপ দ্বারা নিজেদের পরিবেষ্টিত করে ফেলছে অথচ বলছে, তারা জান্নাতি কারণ তারা মুসলিম! আল্লাহ মুসলিম জাতিকে এই ফিৎনা থেকে রক্ষা করুন ও হালাল-হারাম চেনার সুযোগ করে দিন। (আমিন)

“তোমরা কি আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? তাদের মধ্যে একদল ছিল, যারা আল্লাহর বাণী শ্রবণ করত; অতঃপর বুঝে-শুনে তা পরিবর্তন করে দিত এবং তারা তা অবগত ছিল। যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলেঃ আমরা মুসলমান হয়েছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, তখন বলে, পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তাদের কাছে বলে দিচ্ছ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে পালকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি কর না? তারা কি এতটুকুও জানে না যে, আল্লাহ সেসব বিষয়ও পরিজ্ঞাত যা তারা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে? তোমাদের কিছু লোক নিরক্ষর। তারা মিথ্যা আকাঙ্খা ছাড়া আল্লাহর গ্রন্থের কিছুই জানে না। তাদের কাছে কল্পনা ছাড়া কিছুই নেই। অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে। তারা বলেঃ আগুন আমাদিগকে কখনও স্পর্শ করবে না; কিন্তু গণাগনতি কয়েকদিন। বলে দিনঃ তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোন অঙ্গীকার পেয়েছ যে, আল্লাহ কখনও তার খেলাফ করবেন না-না তোমরা যা জান না, তা আল্লাহর সাথে জুড়ে দিচ্ছ। হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পাপ অর্জন করেছে এবং সে পাপ তাকে পরিবেষ্টিত করে নিয়েছে, তারাই দোযখের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে। পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে।” [আল বাকারা : ৭৫-৮২]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

আহলে কিতাবদের সবাই মনে করে তারাই জান্নাতে যাবে

আল্লাহপাক পৃথিবীতে অসংখ্য নবী রাসুল পাঠিয়েছেন। তাদের সবাই একই সত্য প্রচার করেছেন আর তা হলো আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। সকল নবী রাসুল ইসলামই প্রচার করেছে। আল্লাহপাক চাইলে সবাইকে একজন নবীর উম্মত করে পাঠাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। সে ব্যক্তি মুসলমানই নয় যে, পবিত্র কোরান ব্যতীত অন্য সব আসমানী কিতাবকে ঘৃণা করে। কারণ পবিত্র কোরান পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের স্বত্যায়নকারী ও সংরক্ষণকারী। সে ব্যক্তি মুসলমানই নয় যে ব্যক্তি অন্য নবীর উম্মতকে ঘৃণার চোখে দেখে। অনেক মুসলমান মনে করে যে, শুধুমাত্র তারাই জান্নাতে যাবে। অনেক খ্রিস্টান মনে করে যে, কেবলমাত্র তারাই জান্নাতে যাবে। অনেক ইহুদি মনে করে যে, কেবলমাত্র তারাই জান্নাতে যাবে। কিন্তু একমাত্র আল্লাহপাক নির্ধারণ করবেন কারা জান্নাতে যাবে। ইহুদি, খ্রিস্টান, সাবেঈন ও মুসলমানদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে ও সৎকর্ম করে, তারাই তাদের পালনকর্তার কাছ থেকে পুরস্কারে পুরস্কৃত হবে।

আল্লাহপাক অনেক উম্মত পাঠিয়েছেন। প্রতিটি উম্মতের আলাদা আলাদা শরীয়াহ রয়েছে। আর আখিরাতে আল্লাহপাক মীমাংসা করে দেবেন সেসব বিষয় যেসব বিষয় নিয়ে একদল উম্মত আরেকদল উম্মতের সাথে বিতর্কে লিপ্ত থাকত।

পৃথিবীজুড়ে আমরা যদি আহলে কিতাব ও মুসলিমদের লক্ষ্য করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই, একদল আহলে কিতাব পরষ্পরের সাথে যুক্ত হয়ে বিশ্বময় ফ্যাসাদ ও জুলুম করে বেড়াচ্ছে আর একদল মুসলিম এদের সহযোগিতা করছে। ইউরোপীয় ইহুদি ও পশ্চিমা খ্রিস্টানদের মিলিত এই জায়োনিস্ট জোট অত্যাচার, অনাচার, শিরক ও ধর্মহীনতা ছড়াচ্ছে। ন্যাটোর দ্বারা বিশ্বময় যুদ্ধ বিগ্রহ ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। একদল মুসলিম তাদের সহযোগিতা করছে ও মিথ্যে জিহাদ করে ইসলামের নাম খারাপ করছে। এদের বিপরীতে একদল খ্রিস্টান রয়েছে যারা এসব জুলুমের বিরোধীতা করছে, ন্যাটোর সর্বভুক পলিসির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। একদল ইহুদি রয়েছে যারা ফিলিস্তিনিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইজরায়েল রাস্ট্রের বিরোধীতা করছে। একদল মুসলিম রয়েছে যারা মিথ্যে জিহাদ ও জায়োনিস্টদের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত আছে। এরাই হলো সেইসব লোক যারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবে।

“নিঃসন্দেহে যারা মুসলমান হয়েছে এবং যারা ইহুদী, নাসারা ও সাবেঈন, (তাদের সবার মধ্য থেকে) যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তার সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।” [সুরা বাকারা ২:৬২]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

আল্লাহ্‌র কিতাবে রদবদল ও তার শাস্তি

আল্লাহপাক বনী ইজরায়েল জাতিকে আসমানী কিতাব তওরাত দান করেছিলেন। কিন্তু তারা সে কিতাবকে নিজেদের লাভের জন্য পরিবর্তন করে। কিতাবের শব্দ ও বাক্য বদলে দেয়। যখন আল্লাহপাক তাদের জেরুজালেমে প্রবেশ করতে বলেন, তখন তাদেরকে মাথা নত করে সে শহরে ঢুকতে আদেশ দেন ও তাদেরকে “আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও” — এই দোয়া পড়ে ঢুকতে বলেন। কিন্তু তারা এই শব্দ পালটে ফেলে। এভাবে তারা তওরাতের বাক্য পরিবর্তন করত। আর তাদের সবচেয়ে বড় সবচেয়ে মারাত্মক ও সবচেয়ে ধূর্ত পরিবর্তন ছিল তওরাতে এই বাক্য ঢোকানো যে, নীল নদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত সমস্ত জায়গা পবিত্র ভূমির অন্তর্ভুক্ত ও এই জায়গা বনী ইজরায়েল পাবে। তাই ইজরায়েল নীল নদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত সমস্ত জায়গা পাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছে। এই পরিকল্পনাকে বলে “জিনন প্ল্যান।”

শেখ ইমরান হোসেইন তার “সুরা কাহফ ও বর্তমান বিশ্ব” গ্রন্থে বনী ইজরায়েলের তওরাতের মধ্যে রদবদল করা সম্পর্কে লিখেন,

“তওরাতের মূল বইয়ের মধ্যে বিকৃতির কারণে পরবর্তী কালের ইহুদিদের পক্ষে একজন অইহুদিকে নবী হিসেবে মেনে নেয়া অসম্ভব ছিল। তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস ঢোকানো হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর বাছাইকৃত জাতি। তারা মনে করত, মানবজাতির আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব তাদের হাতে। সে কারণে দুনিয়ার শেষ পর্যায়ে দুনিয়াকে তারাই শাসন করবে, এই ছিল তাদের বিশ্বাস। তারা মনে করত, অ-ইহুদিদের আধ্যাত্মিক মর্যাদা তাদের চেয়ে নিম্নমানের, তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব যে একজন অ-ইহুদি আল্লাহর নবী হিসেবে মনোনিত হবে! বিশেষ করে আরবরা হলো ঈসমাইল (আ) এর বংশধর, আর তওরাতে তাঁর সম্পর্কে যা লেখা রয়েছে তারপরে তো একজন আরব নবী হবে সেটা চিন্তাই করা যায় না। সেখানে লেখা রয়েছে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ছিল ইসহাক (আ) এর সাথে, ঈসমাইল (আ) এর সাথে নয়। আরো কটুক্তি করে লেখা রয়েছে, ‘মানুষ হলেও সে বুনো গাধার মত হবে; সে সবাইকে শত্রু করে তুলবে এবং অন্যেরাও তাকে শত্রু মনে করবে।’ (তৌরাত: পয়দাদেশ ১৬:১২)
তথাপি ইয়াসরিবের (এখনকার মদিনা) ইহুদি রাবাইদের কাছে এটা হতাশাজনকভাবে পরিষ্কার ছিল যে, মুহাম্মদ (সা) অবশ্যই আল্লাহর একজন সত্যিকার নবী ছিলেন। ইহুদিরা ক্ষুদ্ধ ছিল যে, সুমহান আল্লাহ শেষ ওহীর গ্রহীতা হিসেবে একজন আরবকে পছন্দ করেছিলেন। এটা মেনে নিলে তারা মানতে বাধ্য হতো যে তারা তৌরাতে বিকৃতি ঘটিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, আরবদের উপর জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবির পক্ষে তাদের আর কোন কেতাবি সমর্থন থাকত না। পবিত্র কোরান আসার আগে তওরাতসহ অন্যান্য সকল ধর্মগ্রন্থকে বিকৃত করা হয়েছিল। তাই দাজ্জালকে এবং তার আক্রমণের লক্ষ্যকে বোঝার জন্য যে আভাস ইঙ্গিতের দরকার তা পাওয়া যাবে তওরাতসহ এই সকল ধর্মগ্রন্থের বিকৃতির ভেতরে।দ্বিতীয়ত, যেহেতু কোরানের মধ্যে কোন অসংলগ্নতা নেই এবং চিরকাল এরকমই থাকবে, তাই একমাত্র কোরানই তৌরাতসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সব ধরণের বিকৃতিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম। সেকারণে সব ধরণের বিকৃতিকে খুঁজে বের করার জন্য কোরানকে গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা উচিৎ। অতএব, শুধু কোরান নয়, বাকী ধর্মগ্রন্থগুলোকেও গভীরভাবে অধ্যয়ন করা জরুরী।

যদি আমরা তওরাতের অধ্যয়ন না করি এবং মানুষের হাত এতে কী ধরণের পরিবর্তন এনেছে তা আবিষ্কার না করি, তাহলে কিছুতেই বুঝতে পারব না এ যুগে রিবা, মদ ও মাদকদ্রব্যের ছড়াছড়ি কেন বেড়ে চলেছে। আমরা বুঝতে পারব না মাদকাশক্তির সাথে ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ের কি সম্পর্ক। একইভাবে আমরা রিবাভিত্তিক অর্থনীতির উৎস, কাগুজে মুদ্রা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক মুদ্রার প্রবর্তনের কারণ বুঝতে পারব না।
মহানবী (সা) বলেছেন, “ইসলামে দেয়া সব কটি গিরা আস্তে আস্তে খুলে যাবে। প্রথমটি আল্লাহর কিতাবে দেয়া নিয়মাবলী আর শেষটি হলো নামাজ।” (মুসনাদে আহমদ)

আল্লাহর কিতাবে পাঠানো নির্দেশগুলো রদবদল করার জন্য মদের প্রতি আসক্তি বেড়ে গেছে। একইকথা রিবার ক্ষেত্রেও সত্য।

আল্লাহর কিতাবে রদবদল করা শিরক। বনী ইজরায়েল এই শিরক করেছিল। আর এই শিরকের শাস্তি হিসেবে আল্লাহপাক দাজ্জালকে পাঠিয়েছেন যে তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে ও একদিন তাদের ধ্বংসের কারণ হবে।”
.
“আর যখন আমি বললাম, তোমরা প্রবেশ কর এ নগরীতে এবং এতে যেখানে খুশী খেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে থাক এবং দরজার ভিতর দিয়ে প্রবেশ করার সময় সেজদা করে ঢুক, আর বলতে থাক-‘আমাদিগকে ক্ষমা করে দাও’-তাহলে আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করব এবং সৎ কর্মশীলদেরকে অতিরিক্ত দানও করব। অতঃপর যালেমরা কথা পাল্টে দিয়েছে, যা কিছু তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল তা থেকে। তারপর আমি অবতীর্ণ করেছি যালেমদের উপর আযাব, আসমান থেকে, নির্দেশ লংঘন করার কারণে।” [সুরা বাকারা: ৫৮-৫৯]

ইসলামী কলিযুগবিদ্যা

মুসলমানদের লজ্জা

আমার পাশের যাত্রীটি ছিলেন মাশাআল্লাহ্‌ সমঝদার লোক। তিনি বললেন, ইহুদীদের শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান গরীমা মুসলমানদের চেয়ে বেশী। সারা ওয়ার্ল্ডে তাদের পপুলেশন সর্বোচ্চ ১৫ মিলিয়ন মানে দেড় কোটি। তারপরও তাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক ডক্টরেট, অগুনিত নোবেল প্রাইজ বিজয়ী। কারণ তারা জ্ঞানের চর্চা করে, আর আফসোস মুসলমানদের লজ্জা যে তারা জ্ঞানের চর্চা করে না। আলহামদুলিল্লাহ্‌, বাস থেকে নামার কিছুক্ষণ পূর্বেই মুসলমানদের লজ্জার বিষয়টা আমার কাছে ক্লিয়ার হলো। কুরআন এই বিষয়টিকে এড্রেস করেছে। বাসায় এসে নেট ঘেটে দেখি সত্যিই Jews are world’s best-educated religious group.

Why the Jews Are so Educated?
তাদের পড়াশোনা অনেক দীর্ঘ প্রায় ১৪ বৎসর। এরপরই খ্রিস্টান, নাস্তিক ও বৌদ্ধদের অবস্থান। মুসলমানদের পড়াশোনা সবচেয়ে কম। গড়ে মাত্র সাড়ে ৫ বছর। ইহুদীরা কৃষি কাজে আসার বদলে চিকিৎসা, প্রকৌশল এবং পুজি বিনিয়োগ ইত্যাদি পেশায় আত্মনিয়োগ করে। কারণ তারা দীর্ঘ জীবন তথা অমরত্ব চায় এবং চায় বিশ্বকে শাসন করতে। এজন্য তারা টেকনোলজি ও কমার্সকে ব্যবহার করে।

ফলে মুসলমানরা তাদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারে না। এটাই মুসলমানদের লজ্জার স্থান। আল্লাহ্‌ মুসলমানদের এ লজ্জা গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু হাদিসে আছে, যখন বান্দা কোন কিছু প্রকাশ করে দেয় যা আল্লাহ্‌ গোপন রেখেছিলেন তখন আল্লাহ্‌ও সেটা প্রকাশ করে দেন। ফলে যখন জাগতিক বিষয়ে ইহুদীদের তুলনায় মুসলমানদের দুর্বলতা তাদের সামনে প্রকাশিত হয় তখন মুসলমানরা লজ্জায় কুকড়ে যায়। তখন কিছু মুসলমান চায় ইহুদিদের শিক্ষা দীক্ষা তথা নিষিদ্ধ বৃক্ষ গলাধকরণ করতে। আধুনিক জীবনের লোভে। কিন্তু তা তারা গিলতে পারে না। গলায় আটকে যায়। আর এভাবে তারা শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যায়।

“অতঃপর তাদের লজ্জাস্থান যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল, তা প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিল; সে বললো, আল্লাহ্‌ তোমাদের ঐ (অমরত্ব ও চিরস্থায়ী শাসনের) বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করেন নাই, তবে এ কারণে নিষেধ করেছেন যে, যদি তোমরা ঐ গাছের কাছে যাও তাহলে ফেরশতাদের মতো হয়ে যাবে (রোগব্যাধি, দুঃখকষ্টহীন) এবং চিরস্থায়ী জীবন (তথা অমরত্ব) লাভ করবে।”

“… যখন তারা সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফলের স্বাদ গ্রহণ করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা বেহেশ্তের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। এবং তাদের রব তাদের ডেকে বললেন, আমি কি এ গাছের নিকটবর্তী হতে তোমাদের নিষেধ করিনি? আমি কি তোমাদের দু’জনকে বলিনি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭ঃ২০,২২)

শেষ যুগে ঈসা (য়ালাইহিস সালাম) আগমনের পর যখন প্রমাণিত হবে, এসব অমরত্ব ও চিরশাসন লাভের জন্য জাগতিক বিজ্ঞান ও ব্যাংকিং মুসলমানদের জন্য নয় তখন তারা তওবা করবে এবং বেহেশতের পাতা তথা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নিজেদের আবৃত করবে। এবং বলবে, “হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বো।” (৭ঃ২৩)

মুসলমানরা সেদিন বুঝতে পারবে, কুরআন ও সুন্নাহই তাদের প্রকৃত চাঁদর যা তারা এতোদিন সরিয়ে রেখেছিল, ফলে তাদের উলঙ্গপনা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। তারা আল্লাহ্‌র আইনকে অমান্য করে ইহুদিদের তৈরী করা আইন গ্রহণ করেছিল। কুরআনের দরস থেকে বের হয়ে এসে মুসলমান আলেমরা ইহুদীদের দ্বারা স্বীকৃত সার্টিফিকেটের জন্য হাত পেতেছিল। এটাই তাদের জন্য লজ্জা। “হে বনী আদম, আমি তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও সাজসজ্জার জন্য তোমাদের নিকট পোশাক পরিচ্ছেদ (কুরআন) নাযিল করেছি, এবং তাক্বওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। (অর্থাৎ তোমরা এই সর্বোত্তম পোশাক গ্রহণ করো) এটা আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা চিন্তাভাবনা করে।” (৭ঃ২৬)

নিঃসন্দেহে এখানে এই পোশাক কুরআনের কথা বলা হয়েছে, কারণ কুরআনই আল্লাহ্‌র সর্বোত্তম নিদর্শন এবং এটা যারা চিন্তাভাবনা করে তাদের জন্যই।

বনী ইসরাইলদের ও বর্তমান মুসলমানদের গরু পূজা

যখন কোন শক্তিশালী জাতি অন্য কোন জাতিকে শাসন করে, তখন সেই শাসিত জাতি শাসক জাতির সংস্কৃতি, ধর্ম, আইন কানুনের দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত হয় যে, শাসিত জাতির নিজেদের সংস্কৃতি, ধর্ম, শরীয়াহকে তারা ভুলে যায় ও যুক্তিহীন মনে করে। যখন বনী ইজরায়েল মিশরে ছিল, তখন তারা মিশরীয় সংস্কৃতি, ধর্ম ও শরীয়াহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায় এবং ইসলামী সংস্কৃতি, ধর্ম ও শরীয়াহকে তারা অবজ্ঞা করতে থাকে। মিশর ভারতীয় উপমহাদেশের মত কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। তাই তারা গরু-বাছুরকে খুব সম্মান করত ও তার মূর্তি বানিয়ে পূজা করত। এটা তাদের দৃষ্টিতে ছিল যৌক্তিক একটা কাজ। গরু-বাছুরকে পূজা করলে ফসল ভালো হবে। বনী ইজরায়েলও এই যুক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।

যখন হযরত মুসা (আ) কিতাব আনতে পাহাড়ে যান, তখন তাঁর অনুপস্থিতিতে বনী ইজরায়েল বাছুরের মূর্তি বানিয়ে পূজা করতে থাকে অথচ তারা এক আল্লাহর কুদরত দেখেছে যে, কীভাবে তিনি বিশ্ব পরাশক্তি ফেরাউনের মিশরের হাত থেকে তাদের রক্ষা করেছেন। যখন হযরত মুসা (আ) ফিরে আসলেন, তিনি এই শিরক দেখে ভীষণ রাগান্বিত ও মর্মাহত হলেন। আল্লাহ বনী ইজরায়েলের তওবা কবুল করলেন কিন্তু কাফফারা হিসেবে তাদেরকে পরষ্পরের সাথে যুদ্ধ করতে হলো ও বহু প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো।

একইভাবে, ব্রিটিশরা যখন কলোনিজমের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোতে শাসন করে, তখন তারা তাদের পশ্চিমা সভ্যতা, পশ্চিমা সংস্কৃতি ও পশ্চিমা শরীয়াহ শিখিয়ে যায়। মুসলিমরা নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, শরীয়াহ, রাজনীতি ভুলে তাদেরটা গ্রহণ করে। কারণ সেটাই তাদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমাদের বাছুরের পূজা করতে শুরু করে আর আল্লাহর সংবিধানকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। আর এজন্যই মুসলিমদের আজ এত বেশী করে রক্ত দিতে হচ্ছে। এজন্যই সমগ্র বিশ্বে মুসলিম আজ অসহায়। আর মালহামা ও মালহামা পরবর্তী যুগ হবে মুসলিমদের জন্য আরো বড় পরীক্ষাকেন্দ্র।  

“আর যখন আমি মূসার সাথে ওয়াদা করেছি চল্লিশ রাত্রির অতঃপর তোমরা গোবৎস বানিয়ে নিয়েছ মূসার অনুপস্থিতিতে। বস্তুতঃ তোমরা ছিলে যালেম। তারপর আমি তাতেও তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নাও। আর (স্মরণ কর) যখন আমি মূসাকে কিতাব এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বিধানকারী নির্দেশ দান করেছি, যাতে তোমরা সরল পথ প্রাপ্ত হতে পার। আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা তোমাদেরই ক্ষতিসাধন করেছ এই গোবৎস নির্মাণ করে। কাজেই এখন তওবা কর স্বীয় স্রষ্টার প্রতি এবং নিজ নিজ প্রাণ বিসর্জন দাও। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর তোমাদের স্রষ্টার নিকট। তারপর তোমাদের প্রতি লক্ষ্য করা হল। নিঃসন্দেহে তিনিই ক্ষমাকারী, অত্যন্ত মেহেরবান।” [আল বাকারা: ৫১-৫৪]

রাসূলুল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী ইহুদী খ্রিস্টানদের অনুসরণ করবে প্রতি গজে গজে এবং প্রতি বিঘতে বিঘতে। এমনকি তারা যদি গুই সাপের গর্তেও প্রবেশ করে তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে। (বোখারী, মুসলিম)

@ Md Arefin Showrav

ঈসা (আ)-এর সাথে ইহুদীরা কেমন আচরণ করল !

ঈসা (আ) এর মাতা বিবি মরিয়ম নাছেরা নামক একটি শহরের অধিবাসিনী ছিলেন। নাছেরা শহরটি বাইতুল মুকাদ্দাসের অদূরেই অবস্থিত ছিল। বিবি মরিয়ম যদিও আল্লাহর কুদরতে সন্তানসম্ভবা হলেন, কিন্তু দেশের লোকেরা তা মেনে নেয়নি। কুমারী নারীর এভাবে গর্ভবতী হওয়ার ফলে সবাই তাকে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দিলেন-এমন কি তাকে স্বগ্রামও ছেড়ে যেতে হলো। সঙ্গী সহায়হীন অবস্থায় গর্ভবতী মরিয়ম একটি নির্জন প্রান্তরে সন্তান প্রসব করলেন।

বিপদাপন্ন মরিয়ম কোনো আশ্রয় খুঁজে না পেয়ে একটি শহরের দ্বারপ্রান্তে আস্তাবলের একটি পতিত প্রাঙ্গণের একটি খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। হায়-যিনি পৃথিবীর মহা সম্মানিত নবী, তিনি সেই নগণ্য স্থানে ভূমিষ্ঠ হলেন। যে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর ধর্ম ইসলাম আজ পৃথিবীময় বিসতৃত, শক্তি এবং সম্মানে যারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকারী; তাদেরই পূর্বসূরী নবী ভূমিষ্ঠ হলেন একটি আস্তাবলের অব্যবহার্য আঙিনায়। দরিদ্রতম পিতা-মাতার সন্তানও এই সময় একটু শয্যালাভ করে থাকে, একটু শান্তির উপকরণ পায়, কিন্তু মরিয়মের সন্তান শোয়ানোর জন্য আস্তাবলের ঘরটুকু ছাড়া আর কিছুই ভাগ্যে হলো না।

সন্তান দিন দিন বড় হতে লাগল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঈসা (আ)-এর মধ্যে প্রখর জ্ঞান এবং তীক্ষ্ণ মেধাশক্তির পরিচয় ফুটে উঠল। আল্লাহর বিশেষ একটি অনুগ্রহ যে তাঁর ওপর রয়েছে, দিন দিন তা প্রকাশ পেতে শুরু করল। মাত্র ১২ বছর বয়সে ঈসা (আ) জেরুসালেমে বড় বড় জ্ঞানী এবং পণ্ডিতবর্গের সাথে ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর বাকপটুতা এবং তত্ত্বজ্ঞান শুনে পণ্ডিতরা অবাক হয়ে যেতেন। ক্রমান্বয়ে হযরত ঈসা (আ) আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ করতে লাগলেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ‘ওহি’ লাভ করেন এবং নবীরূপে ধর্মপ্রচার করতে শুরু করলেন।

হযরত ঈসা (আ.) যখন নবী হন, সেকালে ইয়াহুদি ধর্মগুরুরা অতিশয় শিথিল হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মানুভূতির পরিবর্তে ভণ্ডামি প্রবেশ করেছিল। তাদের মধ্যে কেবল ধর্মের বাহ্যিক আবরণ ছিল। হযরত ঈসা (আ.) এসবের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি তাঁর ওয়াজ বক্তৃতায় ইয়াহুদি ধর্মগুরুদের কঠোর সমালোচনা করতেন। এতে সেই সকল বাহ্যাবরণ বিশিষ্ট ইয়াহুদি ধর্মপ্রচারকরা হযরত ঈসা (আ.)-এর ঘোর শত্রুতে পরিণত হন। কিন্তু হযরত ঈসা (আ.)-এর বাণী ছিল আল্লাহর বাণী। তা এমনই হৃদয়গ্রাহী হতো যে, যে শুনত তার হৃদয়ই তাতে আকৃষ্ট হতো। বিদ্বেষপরায়ণ ইয়াহুদি রাব্বিরা কোনো কথায়ই হযরত ঈসা (আ.) কে ধরতে পারতেন না। তারা হযরত ঈসা (আ.)-কে নানা ছুতানাতায় দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন।

হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর অত্যধিক প্রেমে অভিভূত দেখে ইয়াহুদীরা অপবাদ দিল তিনি নাকি বলেছেন আল্লাহ্‌ তার পিতা। ঈসা (আ)-এর অন্তর্ধানের পর (Disappearance) ছদ্মবেশী ইহুদী সেইন্ট পল এ বিষয়টিকে তত্ত্ব আকারে প্রতিষ্ঠা করল ঈসা (আ)-এর একত্ববাদের মতাদর্শ ধ্বংস করার জন্য। এরূপ আরো দুই-একটি দৃষ্টান্তমূলক বাক্য নিয়ে হিংসাপরায়ণ ইয়াহুদি আলেমগণ নানা কথা সৃষ্টি করলেন। এভাবে তারা হযরত ঈসা (আ.) কে ধর্মদ্রোহী কাফের বলে ফতোয়া দিলেন। তাদের শরিয়তে মৃত্যুই সেই সকল অপরাধের একমাত্র সাজা। দেশে তখন রুমীয়দের রাজত্ব ছিল। তখনকার দিনে রাজা ছাড়া আর কারো মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার ছিল না। সুতরাং তারা সম্রাটের কানে হযরত ঈসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে শুরু করল।

হযরত ঈসা (আ.) তার বক্তৃতার অধিকাংশ সময় আসমানি বাদশাহের কথা উল্লেখ করতেন। এতে শত্রুদের একটি সুযোগ জুটে গেল। তারা আসমানি বাদশাহীর ব্যাখ্যা একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি রাজদ্রোহীর অভিযোগ সৃষ্টি করল। গোপনভাবে তাকে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

তৎকালীন রোম সম্রাট ছাতিয়ূনুস-এর নির্দেশে ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতারের জন্য সরকারী বাহিনী ও ইহুদী চক্রান্তকারীরা তাঁর বাড়ী ঘেরাও করে। তারা জনৈক নরাধমকে ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্য পাঠায়। কিন্তু ইতিপূর্বে আল্লাহ ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেন এবং তা সর্বকালের জন্য ইয়াহুদী এবং খ্রিস্টানদের জন্য বিভ্রান্তিস্বরূপ রয়ে যায়।

ইতিহাস তার ঘটনা পুনরাবৃত্তি করে। তবে সবাই সেসব দেখতে পায় না। কারণ দেখার মতো চোখের প্রচন্ড অভাব। আজকের দিনেও একই ঘটনা প্রকাশমান।

পেয়ারা নবীজী হযরত মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী ইহুদী খ্রিস্টানদের অনুসরণ করবে প্রতি গজে গজে এবং প্রতি বিঘতে বিঘতে। এমনকি তারা যদি গুই সাপের গর্তেও প্রবেশ করে তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে। এই হাদীসটি বোখারীতেও আছে, মুসলিমেও আছে। মুত্তাফাকুন য়ালাইহি। কেউই এই হাদীসটি অস্বীকার করতে পারবে না। Sahih hadith, No doubt about it.

আজকের দিনেও মুসলমান আলেম উলামাদের মধ্যে দ্বীনের ব্যাপারে শিথিলতা চলে এসেছে। তারা মুখে যদিও কুরআনের কথা বলেন, বাস্তবে পবিত্র কুরআনের সংবিধান ত্যাগ করে দাজ্জালের দ্বীপ ব্রিটেনের সংবিধান গ্রহণ করেছেন। ব্রিটেনের শিক্ষাব্যবস্থার সমমানের সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছেন। ব্রিটেনের রাজনৈতিক পন্থা গ্রহণ করেন। মুসলিম উম্মাহর অখন্ডতাকে বিভক্ত করে ব্রিটেন কর্তৃক নকশাকৃত মানচিত্র গ্রহণ করেন। সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিলিয়ে মিশিয়ে প্রচার করেন। একদিকে বলেন, সুদ খাওয়া হারাম; অন্যদিকে বলেন, কাগুজে মুদ্রা হালাল! একদিকে বলেন, মূর্তি সরাও; অন্যদিকে বলেন, গণতন্ত্র হালাল! একদিকে বলেন ইসলামে সন্ত্রাসবাদ নেই, অন্যদিকে কুরআনে বর্ণিত রূমের বিরুদ্ধে আইএস, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সন্ত্রাসকে সাপোর্ট করেন। কুরআনের পররাষ্ট্রনীতি বাদ দিয়ে মনগড়া পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করেন। এভাবে মুসলিম দেশগুলো আল্লাহপাক যা হালাল করেছেন তাকে হারাম ও হারামকে হালাল করছে। তারা আইএমএফের কথা মেনে স্বর্ণমুদ্রার ব্যবহারকে হারাম করেছে। ১৮ বছরের নীচে বিবাহকে হারাম করেছে। এরকম আরো অনেক।

যদি কেউ এগুলো চোখে আংগুল দিয়ে ধরিয়ে দিতে চায় তারা বলেন, এ কাফের। তখন তারা প্রশ্ন করেন, তোমাদের দ্বীনী পিতা কে? যখন তারা দেখেন, এরা অতি সাধারণ, এদের কোন বাবা হুজুর, দাদা হুজুর নেই, মাদ্রাসার ঐতিহ্যবাহী ফিরাসে তাদের জন্ম নয়, তখন তারা অবাক হন, বাবা হুজুর ছাড়া তোমাদের দ্বীনী জন্ম কিভাবে হলো।

অতএব তারা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। কিন্তু তারা ভুলে যান, আল্লাহ্‌ তায়ালাও কৌশল করেন, আর আল্লাহ্‌ শ্রেষ্ঠতম কুশলী। নিশ্চয়ই তিনি তার সত্য পথের অনুসারীদের নিরাপদ ওবং কিয়ামত পর্যন্ত পবিত্র ও সমুন্নত রাখবেন। আর তখন তা কেবল অপবাদ আরোপকারীদের বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি করবে।